প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬
ময়মনসিংহে ধীরগতিতে চলছে শিশু হাসপাতালের নির্মাণকাজ
আওলাদ রুবেল , স্টাফ রিপোর্টার ||
ময়মনসিংহ অঞ্চলের শিশুদের মানসম্মত ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নির্মাণাধীন শিশু হাসপাতাল প্রকল্পটি এখন চরম অনিশ্চয়তায়। ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করে হাসপাতালটি চালু করার লক্ষ্য থাকলেও নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও সরকার পরিবর্তনের আবহে গত ১৮ মাস ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ ছিলো এর নির্মাণকাজ। ফলে বৃহত্তর ময়মনসিংহের লাখো মানুষ কাঙ্খিত বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর কাজশুরু হলেও ধীরগতিতে চলছে সেই কাজ। এদিকে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে শিশু মৃত্যু বেড়েই চলছে। বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের বাইরের করিডোর ও বারান্দায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মেঝে ও বারান্দার স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে শিশুদের নিয়ে দিন কাটছে অভিভাবকদের। এই হাসপাতালের তিনটি ইউনিটে অনুমোদিত শয্যা মাত্র ৬০টি। কিন্তু সেখানে প্রতিদিন গড়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর এই বিপুল চাপে প্রতিদিন সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।মমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ফোকাল পার্সন ডা. গোলাম মাওলা এ প্রসঙ্গে বলেন, "সীমিত সম্পদ ও শয্যা নিয়ে আমাদের প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। এখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় শতভাগ মানসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুদের জন্য যদি একটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল দ্রুত চালু করা যায়, তবেই চিকিৎসার মান বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে এবং এই অঞ্চলের শিশুরা প্রকৃত চিকিৎসাসেবা পাবে।"ময়মনসিংহবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে একটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। তবে জমি সংক্রান্ত জটিলতা, স্থান নির্বাচন ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাজ শুরু করতেই পার হয়ে যায় দীর্ঘ ছয়টি বছর। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে নগরীর বাড়েরা এলাকায় ৩ একর জমির ওপর ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা ভিত্তির ওপর দ্বিতল এই শিশু হাসপাতাল নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং কাজ শুরু হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি।মমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসাধীন এক শিশুর অভিভাবক মো. হেলাল উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এখানে বাচ্চার চিকিৎসা করাতে এসে আমাদের বারান্দার মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। গরমে আর মশার কামড়ে সুস্থ মানুষই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। শিশুদের জন্য আলাদা হাসপাতালটির কথা শুনছি অনেক দিন ধরে, কিন্তু সেটি চালু হচ্ছে না। হাসপাতালটি চালু হলে আমাদের মতো গরিব মানুষের ভোগান্তি কমত এবং বাচ্চারা একটু ভালো চিকিৎসা পেত।"স্থানীয় বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন,কাজ পুনরায় শরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু মালামাল গুলো যাচাই-বাচাই করা উচিৎ। তারা নিন্মমানের অনেক সামগ্রী ব্যবহার করছে। আমরা চাই সঠিক মালামাল ব্যবহার করে কাজ করা হোক। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে কাজ থমকে থাকায় স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যেও চরম হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, "একটি জনগুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রকল্প এভাবে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় প্রকল্প নেওয়া হয়, অথচ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখে না। আমরা অবিলম্বে এই শিশু হাসপাতালের কাজ শেষ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।"সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রকল্প নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে ভবনটি গণপূর্ত বিভাগের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও 'প্রজেক্টে'র মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফান্ডিং জটিলতা ও মেয়াদ বৃদ্ধি না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কোনো অগ্রগতি ছিলো না । এখন কাজ পুনরায় শুরু হলেও চলছে আস্তে আস্তে।কাগজে কলমে কাজ চালু থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সরেজমিন দেখা যায় কোন লেবার বা কর্মকর্তা মাঠে কাজ করছেন না। প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাইট ইঞ্জিনিয়ার রাজিবুল হক বলেন, "প্রকল্পের সময়সীমা গত বছরের জুনে শেষ হয়ে যাওয়ায় কারিগরি ও আইনি কারণে কাজ সাময়িক বন্ধ ছিলো। তবে আমরা কাজ পুনরায় শুরু করেছি খুব দ্রæত বাকী কাজ করা সম্ভব হবে। কাজ শেষ করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।"এদিকে, জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা এবং নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে রাজি হননি ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের কোনো প্রকৌশলী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। পরবর্তীতে মুটোফুনে যোগাযোগ করলে ময়মনসিংহের গনপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস বলেন,আমরা পুনরায় কাজ শুরু করেছি আগামী মার্চ মাসের মধ্যেই বিল্ডিং হস্তান্তর করতে পারবো বলে ধারনা করছি। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে লাইনটি কেটে দেন। কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় সচেতন মহলে। সাধারণ মানুষের দাবি, সব ধরনের জটিলতা পেছনে ফেলে দ্রুতই এই হাসপাতালটির কাজ শেষ করে তা চিকিৎসার জন্য উন্মুক্ত করা হোক। নির্মাণ কাজে সঠিক মালামাল ব্যবহার করলে বিল্ডিং মানসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী হবে বলেও জানায় সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদক : এস এ শাহরিয়ার মিল্টন
মাহফুজা প্লাজা, ৫মতলা, শেরপুর শহর , শেরপুর।
প্রয়োজনে : ০১৭১১৬৬৪২১৭ । মেইল : hellosherpurtimes@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ SherpurTimes24 । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত