প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুলাই ২০২৬
ফুলপুরে খলিলের গ্যারাকলে বাড়ি ছাড়া মা-ছেলে
আওলাদ রুবেল , স্টাফ রিপোর্টার ||
প্রথমে গ্রামের অসহায় পরিবারকে টার্গেট করে ব্যাংক থেকে কৃষি লোন পাইয়ে দেওয়ার রফাদফা। পরে একাউন্ট করিয়ে চেক হাতিয়ে নিয়ে আদালতে মামলা করে মোটা অংকের অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহের ফুলপুরের খলিল রহমান মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। খলিলের এমন প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোন সুরাহা পাচ্ছেন না।জেলার ফুলপুর উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা নেওয়াজ শরীফ ও নুরেছা বেগম। তারা সম্পর্কে মা ছেলে। নুরেছার স্বামী মারা যাওয়ার পর চেয়েচিন্তে চলতো সংসার। নেওয়াজ শরীফের চাচা জিয়াউর রহমানের তৈরি করে দেওয়া ঘরেই তাদের বসবাস।২০২২ সালের ৩১ আগস্ট সংসারের স্বচ্ছতা ফেরাতে প্বার্শবর্তী কুকাইল গ্রামের খলিলুর রহমান মণ্ডলের মাধ্যমে ফুলপুর কৃষি ব্যাংক থেকে মা-ছেলে যৌথ নামে দুই লাখ টাকা ঋণ উত্তোলন করেন। এরমধ্যে ৫০ হাজার টাকা ঘোষ দিতে হয় খলিলকে। সেই সাথে খলিল ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা বলে তিনটি ব্ল্যাংক চেক নিজের কাছেই রেখে দেন।জমিজমা নিয়ে জিয়াউর রহমানের সাথে খলিলের বিরোধ সৃষ্টি হলে, খলিল ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর ময়মনসিংহ আদালতে চেক জালিয়াতির মামলা করেন মা-ছেলের বিরুদ্ধে।সম্প্রতি চন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস নেওয়াজ শরীফ ও নুরেছা বেগমের। দুজনেই ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মামলা হওয়ার পর থেকে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছেন মা-ছেলে। ভয়-আতংকে দিন কাটছে তাদের।ভুক্তভোগী নেওয়াজ শরীফ বলেন, পূর্ব পরিচিত খলিল হঠাৎ করে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে দিবে বলে বাড়িতে এসে আলোচনা করে। কিন্তু দুই লাখ টাকা কৃষি লোন তুলে দিতে সে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। তার কথা মত জমির কাগজপত্র এবং তিনটি চেক দিয়ে দুই লাখ টাকা লোন তুলে ৫০ হাজার তাকে দিয়ে দেই। আমার চাচার সাথে খলিলের বিরোধ হলে আমাদের নামে খলিল ৭ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা করে। তার ভূয়া মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ১লা মার্চ খলিলের বাড়িতে বসে ৭ লাখ টাকা ধার নিয়েছি। কিন্তু সেই তারিখে আমি কর্মস্থল ঢাকায় ছিলাম। তার যথেষ্ট প্রমাণও রয়েছে।ভুক্তভোগী নুরেছা বেগম বলেন, খলিল বলছে জমির কাগজ এবং চেক ব্যাংকে জমা দিয়ে কৃষি লোন তুলতে হয়। আমরা সেই বিশ্বাসে সকল কাগজপত্র খলিলের সামনে ব্যাংকের মধ্যে একজনের কাছে জমা দেই। কিন্তু সেই চেক নিয়ে খলিল মামলা করে আমাদের কাছে ৭ লাখ টাকা দাবি করছে। আমাদের তো এতো টাকা দেওয়ার কোন সামর্থ্য নেই।নেওয়াজ শরীফ এবং নুরেছা বেগমের মত খলিলের রোষানলে পড়ে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন একই গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আব্দুল খালেক ফকির।২০২৪ সালে আব্দুল খালেক ফকির ফুলপুর কৃষি ব্যাংকের শাখায় ৭ লাখ টাকার সিসি লোন রিকোভারী করেন। তার সাথেও খলিল মণ্ডলের জমিজমা নিয়ে বিরোধ হলে গত ৯ মার্চ ২৭ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা করা হয়।ভুক্তভোগী ষাটোর্ধ্ব আব্দুল খালেক ফকির বলেন, চেক ব্যাংকে জমা দিয়ে লোন নিয়েছি, কিন্তু সেই চেক দিয়ে খলিল আমার নামে মামলা করেছে। আমি মনে করি আমার এ ঘটনায় ব্যাংকের লোকজনও জড়িত। না হলে খলিল কিভাবে চেক পেলো। আমাদের এলাকায় খলিল কৃষি ব্যাংকের দালাল হিসেবে পরিচিত। এলাকায় শতশত মানুষ লোন নিয়েছে খলিলের মাধ্যমে। এতে খলিল যেমন সুবিধা নিচ্ছে তেমনি ব্যাংকের লোকজনও নিচ্ছে। চেকের মামলায় যাদেরকে সাক্ষী করা হয়েছে তারা নিজেরাও জানেন না। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোন সুরাহা পাচ্ছি না।জনাব আলী নামে একজন বলেন, খলিল মূলত কৃষি ব্যাংকে দালালী এবং দাদনের ব্যবসা করে। সে আমাকেও একটি লোন করিয়ে দিয়েছিল। আবার আমার সম্পত্তির কাগজপত্র দিয়ে আরও দুইজনকে লোন করিয়ে দিয়েছে। নেওয়াজ শরীফ এবং নুরেছা বেগমের বিরুদ্ধে যে মামলা করেছে সেই মামলায় আমাকে সাক্ষী রাখা হয়েছে। কিন্তু আমি তার কিছুই জানি না।স্থানীয় বওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুব আলম ডালিম বলেন, খলিল একজন দালাল। তার টার্গেট গ্রামের অসহায় মানুষ। মানুষকে লোন দিয়ে সেও সুবিধা নিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকের কথা বলে তার কাছে চেক রেখে দিচ্ছে। মতবিরোধ হলেই মামলা করছে। এর দায় ব্যাংক এড়াতে পারে না। তবে তার প্রতারণা শিকার অসহায় মানুষগুলোর পাশে সকলের দাঁড়ানো উচিত।এসব অভিযোগের বিষয়ে ফুলপুর কৃষি ব্যাংকে গেলে পাওয়া যায় খলিলুর রহমান মণ্ডলকে। তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংকে আমার সিসি লোন আছে; তাই নিয়মিত আসা যাওয়া করি। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে, তারা আমার পাওনা পরিশোধ না করায় চেক জালিয়াতির মামলা করেছি। আর চেক ব্যাংক থেকে নেইনি, টাকা নেওয়ার সময় তারাই দিয়েছিল।বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ফুলপুর উপজেলা শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার সাইদুর রহমান বলেন, খলিলুর রহমান মণ্ডল আমাদের একজন ভালো গ্রাহক। তাই তিনি ব্যাংকে নিয়মিত আসেন। আমি খুব বেশি দিন হয়নি যোগদান করেছি, আগে কোন সমস্যা হয়ে থাকলে বলতে পারবো না। তবে এখন দালালের মাধ্যমে লোন নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।ভুক্তভোগীদের আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সজীব সরকার রোকন বলেন, মামলা দুটি সাক্ষীর অপেক্ষায় রয়েছে। আদালতেই নির্ধারিত হবে বিষয়টি।বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ময়মনসিংহ কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক জামিল আহমেদ বলেন, ব্যাংক থেকে চেক বাহিরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আর কৃষি লোনে কোন ধরণের চেক জমা রাখা হয় না। তবে ব্যাংকে যাতায়াতকারী খলিল মণ্ডল আমাদের গ্রাহক। তার মাধ্যমে যদি কোন ব্যক্তি লোন পেয়ে থাকেন এবং প্রতারিত হোন তাহলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সম্পাদক : এস এ শাহরিয়ার মিল্টন
মাহফুজা প্লাজা, ৫মতলা, শেরপুর শহর , শেরপুর।
প্রয়োজনে : ০১৭১১৬৬৪২১৭ । মেইল : hellosherpurtimes@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ SherpurTimes24 । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত