প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
ময়মনসিংহে যৌবনে ফিরেছে ব্রহ্মপুত্র নদ
আওলাদ রুবেল , স্টাফ রিপোর্টার ||
শুষ্ক মৌসুমে কোথাও হাটু সমান পানি, কোথাও জেগে উঠে বালুর চর। থাকে না কোন পাল তোলা নৌকা। দেখা মিলে না জাল হাতে জেলেদের কর্মব্যস্ততা। সরু খালের মত দেখতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে ময়মনসিংহের প্রাণ ব্রহ্মপুত্র নদ। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলেই পুরো চিত্র পাল্টে যায় ব্রহ্মপুত্র নদের। পাড় ভাঙ্গা উত্তাল স্রোত, পাল তোলা নৌকা, জেলেদের মাছ ধরা দেখে মনে হয় হারানো যৌবন আবার ফিরে পেয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ।নদটির নাব্যতা ফিরাতে ২৭৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়েছিলো ২২৭ কিলোমিটার ব্রহ্মপত্র নদ খনন প্রকল্প। সাত বছরে প্রকল্পের মেয়াদ ও বরাদ্দ বেড়েছে কয়েকবার। কিন্তু অর্থ লুটপাট ছাড়া হয়নি কোন কাজের কাজ। বরং মৃত নদটিকে ঠেঁলে দেওয়া আরো মৃত্যুর দিকে। বানিজ্য হয়েছে নদের বালু নিয়ে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চলেছে বালু বিক্রি। রাতারাতি কোটিপতি হয়েছে একটি সিন্ডিকেট। কিন্তু ভাগ্যে পরিবর্তন হয়নি ব্রহ্মপুত্র নদটির। বর্ষা মৌসুমে নদে পানি বাড়লে ময়মনসিংহ ফিরে পায় তার হারানো পরিবেশ। শীতল হয়ে উঠে চারপাশের পরিবেশ। একটু প্রশান্তির জন্য মানুষ ছুটে আসে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। পাল তোলা নৌকায় ভ্রমন করে দেখে নদের সৌন্দর্য। অন্যান্য সময় কোন মাছ পাওয়া গেলেও নতুন পানিতে মিলে বেশ ছোট মাছ। ব্রহ্মপুত্র নদ ঘেঁষে গড়ে উঠা জয়নুল পার্কে ঘুরতে আসা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাইজু ইসলাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর ব্রহ্মপুত্র নদটি দেখতে গতবছর এপ্রিলে এসেছিলাম। তখন নদে পানি ছিলো না বললেই চলে। হাটু সমান পানি, কোথাও মানুষ পায়ে হেটেই নদের এপার থেকে ওপার আসা যাওয়া করছে। তখন নদটিকে একটি খাল মনে হয়েছিলো। কিন্তু আজ এর পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। নদে অনেক পানি। অনেক নৌকা। মন জুড়ানো শীতল বাতাস। দেখে সত্যি ভালো লাগছে।শহরের বাসিন্দা প্রবাল দাস জানান, ছোট বেলায় এই নদে অনেক গোসল করেছি। বন্ধুরা মজা করে মাছ ধরেছি। এখন সেই অবস্থা নাই নদটির। বালু থাকে পানিতে। গোসল ত দুরের কথা এই পানি দিয়ে হাত মুখও ধোঁয়া যায় না। এখন বর্ষা মৌসুম। নদে নতুন পানি এসেছে। পানিতে পরিপূর্ণ। এই অবস্থায় নদটিকে দেখে শৈশবের কথা ভেসে বসছে।পাল তোলা নৌকার মাঝি হান্নান মিয়া জানান, বছরের আট মাস আমাদেরকে নৌকা নিয়ে বসে থাকতে হয়। পানি না থাকায় তখন কেউ নৌকায় চড়ে ঘুরতে চায় না। আর নৌকা চললেও চরে আটকে যেত। তখব ইনকাম থাকত না। এখন নদে পানি এসেছে, সেই সাথে নৌকার যাত্রী বেড়েছে। নৌকা করে ঘুরতে নেওয়া হচ্ছে ঘন্টা প্রতি দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা। এতে ইনকামের পথ হয়েছে।নদের তীরে মাছ ধরতে থাকা নূরুল ইসলাম জানান, এক সময় এই নদে অনেক মাছ ছিলো। অনেক জেলে পরিবার এখানে বসবাস করত। কিন্তু নদটি শুকিয়ে যাওয়ায় মাছ নেই বললেই চলে। জেলে পরিবার চলে গেছে অন্যত্র। আর যারা আছে তারা পরিবর্তন করেছে পেশা। তারপরও যখন নদে পানি বাড়ে তখন ছোট ছোট মাছের দেখা মিলে। জাল ফেললে পুটি, ট্যাংড়া, ছোট চিংড়ি সহ বিভিন্ন মাছ পাওয়া যায়।স্থানীয় বাসিন্দা ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, যখন ব্রহ্মপুত্র নদের খনন কাজ শুরু হয় তখন আমরা ময়মনসিংহবাসী আশায় বুক বেধেছিলাম। ব্রহ্মপুত্র নদটি ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন। কিন্তু খননের নামে শুরু হয়েছে অর্থ অপচয়। নদের নাব্যতা ফেরাতে নয়, মূল কাজ হয়ে উঠে বালু উত্তোলন। এই বালু নিয়ে গড়ে উঠে একটা সিন্ডিকেট। এই বালু বিক্রি করে অনেকে রাতারাতি হয়ে গেছেন কোটিপতি। মাঝখান দিয়ে নষ্ট হলো রাষ্ট্রীয় অর্থ। আমরা চাই পরিকল্পিত ভাবে খনন করা হোক নদটি।পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলনের সভাপতি লে.কর্নেল (অব.) ড. মো: শাহাব উদ্দীন জানান, ময়মনসিংহের মা ব্রহ্মপুত্র নদ পড়ে আছে মৃত অবস্থায়। এখন নদে কিছুটা পানি থাকলেও বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই আবার শুকিয়ে খালে পরিনত হবে। একটা নদের কতটা প্রয়োজনীয়তা তা আমরা না বুঝে ধ্বংস করে যাচ্ছি। খননের নামের চলছে দখলের মহোৎসব। বালু দিয়ে দুপাড় ইতোমধ্যে দখল করে বালু নিয়ে বানিজ্য চলছে। আমরা ভেবেছিলাম নদটি খনন হলে ফিরে পাবে তার প্রাণ প্রকৃতি। কিন্তু সাত বছরে দেখছি তার উল্টো। সরকার এই খনন প্রকল্প বিষয় কঠোর হবেন, আর এই অর্থ বিনষ্টকারীদের আইনের আওয়তায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। কারন তারা ময়মনসিংহবাসীর আবেগ নিয়ে খেলা করেছে।জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মকসুমুল হাকিম চৌধুরী জানান, দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে নদী খননের উদ্যােগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে তার তথ্য চাওয়া হয়েছে। যেসকল নদ-নদী বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো খননের উদ্যােগ নেওয়া হবে। ব্রহ্মপুত্র নদে খনন কাজ চলছে। পানি উনয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএ এর দেখভাল করছে। নদী রক্ষা কমিশন ও প্রশাসন তা তদারকি করছে। খনন কাজ শেষ হলে এঅঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবেন।
সম্পাদক : এস এ শাহরিয়ার মিল্টন
মাহফুজা প্লাজা, ৫মতলা, শেরপুর শহর , শেরপুর।
প্রয়োজনে : ০১৭১১৬৬৪২১৭ । মেইল : hellosherpurtimes@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ SherpurTimes24 । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত