প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ এপ্রিল ২০২৬
নিউজ ডেস্ক ||
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শতাধিক মামলা কেন্দ্র করে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকার অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর পরও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে হঠাৎ করে মানব পাচার ও অর্থ পাচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একটি মামলার তদন্তে অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করলেও একই অভিযোগে এরপরও দুদক মামলা করেছে, যা রহস্যের জন্ম দিয়েছে। তবে দুদকের এসব মামলার কোনোটিতেই কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগকারী নেই, নেই কোনো ভুক্তভোগী বা মানব পাচারের শিকার কোনো ব্যক্তির অভিযোগ, এমনকি অর্থ পাচারের কোনো আলামতও নেই মামলার এজাহারে। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকেও অনিয়মের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানানোর পরও দুদকের একের পর এক মামলা দায়েরে থমকে গেছে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার, অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ব্যবসায়ী ও কর্মীরা। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য ফের উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির রাজধানী পুত্রজায়ায় দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোকে কেন্দ্র করে চলমান মামলা ও তদন্ত নিষ্পত্তির শর্তে ফের শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার কথা বলেছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণাপত্রে এই শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়। ঘোষণাপত্রে সাতটি বিষয় উল্লেখ করে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সব সোর্স কান্ট্রির জন্য প্রযোজ্য একটি ডিজিটাল ও এআই ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর কথা জানানো হয়, যার লক্ষ্য দালালদের দৌরাত্ম্য ও অভিবাসন খরচ কমানো এবং নিয়োগকর্তারাই যেন নিয়োগের সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন, তা নিশ্চিত করা। এর ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকরা ‘জিরো কস্টে’ মালয়েশিয়ায় যেতে পারবে, অর্থাৎ মালয়েশিয়ায় কাজ পেতে তাদের কোনো খরচ থাকবে না।তথ্য বলছে, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরপরই অফিয়া ওভারসিজের (আরএল:১০১০) মালিক ব্যবসায়ী আলতাফ খান মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মানব পাচার ও চাঁদাবাজির একটি মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বেশ কয়েকজনকে দিয়ে তৎকালীন ওসির ওপর চাপ সৃষ্টি করে মামলা গ্রহণে বাধ্য করা হয়। এরপর মামলাটির তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালত থেকে সিআইডিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সিআইডি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, মামলা তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ধারা ৬/৭/৮/৯/১০ তৎসহ দণ্ডবিধির ধারা ৪০৬/৪২০/৩৮৫/৩৮৬/৪২৭/৩৪ অনুযায়ী আলতাফ খানের করা অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তাদের অত্র মামলার দায় হতে অব্যাহতি প্রদানের প্রার্থনা করা হলো। একই সঙ্গে, মিথ্যা মামলা দায়ের করায় বাদীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ১৫ ধারার বিধান অনুযায়ী প্রসিকিউশন দাখিলের প্রস্তাব করা হয় সিআইডির প্রতিবেদন।এরপর বাদী আলতাফ হোসেন আদালতে নারাজি প্রতিবেদন দিলে ফের মামলাটি তদন্ত করার জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে মামলাটি ডিবিতে তদন্তাধীন। এর মধ্যেই একই ধরনের অভিযোগে দুদক মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা করে। সে সময় মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান করে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে মানব পাচার ও অর্থ পাচার হয়নি মর্মে প্রতিবেদন প্রদান করে।দুদকের ‘ত্রুটিপূর্ণ মামলা’ মালয়েশিয়ার পথে কাঁটাযুদ্ধ থামলেও সহসাই কাটছে না তেলের সংকটতথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এপ্রিলে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয়। সেখানে তারা মামলাগুলো অসত্য উল্লেখ করে দুই দেশের স্বার্থে মামলাগুলো প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়। এরপর বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে একই মাসের শেষ সপ্তাহে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে সত্যতা না পাওয়ায় এসব মামলা প্রত্যাহার করা হবে জানিয়ে ফের কর্মী পাঠানো শুরু করার অনুরোধ করা হয়। তবে সে সময় দুদক মামলা প্রত্যাহারের পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে মামলা দিতেই থাকে। যদিও তৎকালীন এই মামলাগুলো দায়ের নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি ছিল বলে জানা গেছে।মামলার তথ্য বিশ্লেষণ: দুদকের মামলাগুলোর নথি সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছে কালবেলা। এতে দেখা গেছে, প্রতিটি মামলার ধরন একই। প্রতিটি মামলার এজাহারে ঐকিক নিয়মে যোগ করে টাকার অঙ্কে বসিয়ে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। কোনো এজাহারেই সুনির্দিষ্ট কোনো ভুক্তভোগীর নাম-ঠিকানা নেই। প্রতিটি মামলার মূল অভিযোগেই বলা হয়েছে—‘আসামিরা অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বায়রার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে সিন্ডিকেট করে বিএমইটি ও বায়রার রেজিস্ট্রেশনের শর্ত ভঙ্গ করে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণপূর্বক মালয়েশিয়া শ্রমিক রিক্রুটের জন্য এজেন্ট হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে রিক্রুটেড শ্রমিকদের অবৈধভাবে ক্ষতি সাধন করে বিভিন্ন ধাপে বাড়তি অর্থ গ্রহণের অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি দলের বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে চুক্তিবদ্ধ আইনসংগত পারিশ্রমিক ব্যতীত এবং চুক্তি বহির্ভূত কর্মকাণ্ড করে সরকারের এজেন্ট হিসেবে অবৈধ পারিতোষিক গ্রহণ করে মালয়েশিয়ায় প্রেরিত কর্মীর নিকট হতে পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রতি কর্মীর নিকট হতে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণপূর্বক আত্মসাৎ করেছেন এবং অবৈধভাবে গৃহীত উক্ত অর্থ অবৈধ পন্থায় ছদ্মাবৃত্ত পূর্বক, হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে আসামি দণ্ডবিধির ১২০(বি)/১৬১/১৬২/১৬৩/১৬৪/১৬৫(ক)/৪২০/৪০৯ ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সি যে পরিমাণ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে, সেই সংখ্যাকে ১ লাখ ৫০ হাজার দিয়ে গুণ করে টাকার অঙ্ক বের করা হয়েছে। তার সঙ্গে যোগ করা হয়েছে প্রতি কর্মীর পাসপোর্ট বাবদ ১০ হাজার টাকা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাবদ ৭ হাজার ৫০০ টাকা। সেই মোট টাকার অঙ্কে ছদ্মাবৃত্ত, হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এই অর্থ কোন চ্যানেলে, কীভাবে, কার মাধ্যমে কোথায় লন্ডারিং হয়েছে—এ-সংক্রান্ত তথ্য কোনো মামলার এজাহারেই নেই।এ ছাড়া মামলার এজাহারে আনা অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবের বিস্তর ফারাক দেখা গেছে। সব মামলাতেই বলা হয়েছে—আসামিরা বায়রার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তবে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে অন্তত ৯০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ওই সময়ে বায়রার কোনো পদেই ছিল না। এ ছাড়া এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে ‘বিএমইটি ও বায়রার রেজিস্ট্রেশনের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো—বিএমইটির স্মার্ট কার্ড বা ছাড়পত্র ছাড়া কোনো কর্মীই ইমিগ্রেশন পার হতে পারে না। সেক্ষেত্রে শর্ত ভঙ্গ করে বা অনুমোদন না নিয়ে একজন কর্মীর পক্ষেও মালয়েশিয়া যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মামলার এজাহারে আরও অভিযোগ আনা হয়েছে, ‘রিক্রুটেড শ্রমিকদের অবৈধভাবে ক্ষতিসাধন করে বিভিন্ন ধাপে বাড়তি অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কোনো মামলাতেই কোনো সুনির্দিষ্ট ভুক্তভোগীর তথ্য বিবরণী নেই। কবে কার কাছ থেকে কত টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে, সেই সংক্রান্ত কোনো তথ্য কোনো মামলার এজাহারে উল্লেখ নেই।এজাহারের আরেক জায়গায় মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সরকার নির্ধারিত অর্থের চেয়েও অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো—দুদকের মামলা দায়েরের আগেই বিএমইটি থেকে সালিশি বোর্ড গঠন করে রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কোনো কর্মীর অভিযোগ থাকলে যেসব অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয় এবং সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে ‘গুড সার্টিফিকেট’ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোনো রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেই এজেন্সির লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না। তবে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় বেশিরভাগ লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির নামের তালিকা পাঠানো হয়, যেখানে এই ১০১টি এজেন্সির অধিকাংশই ছিল।জানতে চাইলে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মীর আহমেদ আলী সালাম কালবেলাকে বলেন, ‘অনুসন্ধান পর্যায়ে মূলত একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করা হয়। সেখানে যদি কোনো ভুলত্রুটি থাকে, সেগুলো তদন্তের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়। তদন্তে গেলে আরও বিস্তারিত বিষয় সামনে আসে—কীভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে, কার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে, কারা ভুক্তভোগী—এসব বিষয় তখন পরিষ্কার হয়। তবে ভুক্তভোগী সবসময় প্রয়োজন হয় না, কারণ কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স হলে সেটি একটি পেনাল অফেন্স হিসেবে গণ্য হয়। অনেক সময় মামলায় বিভিন্ন ত্রুটি থেকে যায়, তা হতে পারে অনুসন্ধানকারী বা তদন্ত কর্মকর্তার সীমাবদ্ধতার কারণে, আবার অন্য কোনো কারণেও হতে পারে। তবে মামলাটি ট্রায়ালে গেলে এসব ত্রুটি ধরা পড়ে। তখন প্রয়োজন হলে আদালত থেকে ফের তদন্তের জন্য পাঠানো হয়।’তিনি আরও বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়ায় অবশ্যই উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়। প্রসিকিউশনের পাশাপাশি আসামিপক্ষও তাদের ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ পায়। যদি তারা প্রমাণ করতে পারে যে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার পেছনে যুক্তিযুক্ত কারণ ছিল, তাহলে আদালত তা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত দেন।’বাজার খুলতে মামলা প্রত্যাহারের শর্ত মালয়েশিয়ার: মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমবাজার খোলার প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল চলমান মামলাগুলোর নিষ্পত্তি। বৈঠক শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে যে যৌথ ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে সাতটি প্রধান বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে মালয়েশিয়া পক্ষ তাদের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে—এমন যেকোনো ভিত্তিহীন বা বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড (মামলা) বন্ধের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। মূলত এসব মামলার কারণেই শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি থমকে আছে।ঘোষণাপত্রে বলা হয়, পুত্রজায়ায় এক সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক পরিবেশে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে শ্রম অভিবাসন বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। এতে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতোশ্রী রামানান রামাকৃষ্ণ এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণাপত্রে সাতটি বিষয় উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসনে তাদের দীর্ঘস্থায়ী এবং পরস্পরের লাভজনক অংশীদারত্বের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, বাস্তবসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদার করে নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করার পাশাপাশি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করা হবে।বৈঠকে উভয়পক্ষ মালয়েশিয়ার খাতভিত্তিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রম বাজার ফের খোলার প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মত হয়। পাশাপাশি একটি ন্যায্য, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতেও উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যস্থতাকারী ও অভিবাসন খরচ কমানোর জন্য কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্য নিয়োগকারী সংস্থার (রিক্রুটিং এজেন্সি) মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো এবং আটকে পড়া কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা।ঘোষণাপত্রে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সব সোর্স কান্ট্রির জন্য প্রযোজ্য একটি ডিজিটাল ও এআই ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর কথাও জানানো হয়, যার লক্ষ্য দালালদের দৌরাত্ম্য ও অভিবাসন খরচ কমানো এবং নিয়োগকর্তারাই যেন নিয়োগের সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন, সেটা নিশ্চিত করা। এর ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় কাজ পেতে কোনো খরচ থাকবে না, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নির্দেশনা অনুযায়ী ‘নিয়োগকর্তাই পরিশোধ করবেন’ নীতির অংশ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কর্মী পাঠানো অন্য সব দেশকে সম্পৃক্ত করে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে এই ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।উভয়পক্ষ শ্রমিক নিয়োগে মানব পাচার সংক্রান্ত চলমান মামলাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মালয়েশিয়া পক্ষ তাদের আন্তর্জাতিক সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন যেকোনো ভিত্তিহীন বা বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পক্ষ আইনের শাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া, জবাবদিহি এবং সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে।