প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিউজ ডেস্ক ||
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের দীর্ঘদিনের একটি চিত্র ছিল—বড় বহর, দীর্ঘ সফর, বিপুল রাষ্ট্রীয় ব্যয় এবং নানা আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত সময় পার করা। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বড় সফরসঙ্গী দল, একের পর এক বৈঠক এবং নানা কর্মসূচিকে ঘিরে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও অতীতে আলোচনায় এসেছে। সমালোচকদের ভাষায়, কখনো কখনো জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণের চেয়ে সফরের আনুষ্ঠানিকতা ও বহরের আকারই বড় হয়ে উঠেছিল।এবার সেই প্রচলিত রেওয়াজ থেকে বেরিয়ে আসার বার্তা দিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের জাতিসংঘ সফর রাখা হয়েছে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত ও কর্মসূচিনির্ভর। সফরসঙ্গীর সংখ্যাও প্রয়োজনের মধ্যে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা, অতিরিক্ত সময় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় থাকবে না—এমন একটি বার্তাই সামনে এসেছে।এই পরিবর্তনকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফরের কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করার ঘটনা হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্যের পুরোটা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয়সংযম, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রয়োজনের বাইরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয় না করার একটি নীতিগত অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হবে, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে—কিন্তু সেই কাজের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তার বাইরে কোনো আয়োজন না করার দৃষ্টিভঙ্গিই এবারের সফরে গুরুত্ব পাচ্ছে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের শুরুতে সময়সীমা ছিল আরও দীর্ঘ। ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সফরের একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নিউইয়র্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য শহরেও যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু পরে সফরসূচি কাটছাঁট করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২৪ সেপ্টেম্বর ভাষণ দেওয়ার পর দ্রুত দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ অবস্থানের পরিবর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।রাষ্ট্রীয় সফরের ক্ষেত্রে সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। একজন সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরের প্রতিটি দিন মানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, প্রটোকল, যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য নানা ধরনের ব্যয়। ফলে সফরের সময় যতটা প্রয়োজনের মধ্যে রাখা যায়, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ততটাই সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত দেশে ফিরে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন।এবারের সফরের তাৎপর্য এখানেই—বাংলাদেশ বিশ্বসভায় যাচ্ছে, কিন্তু দেখানোর জন্য নয়; প্রয়োজনীয় কাজ করার জন্য। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া, বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং দেশের অবস্থান স্পষ্ট করাই হবে সফরের মূল লক্ষ্য।প্রধানমন্ত্রীর সফরের এই সংক্ষিপ্ততা রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃচ্ছ্রসাধনের বৃহত্তর নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকারি ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমানো এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে সরকার।প্রধানমন্ত্রীর নিজের জীবনযাপন ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে ব্যয়সংযমের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুপুরের খাবার ও নাশতায় ব্যয়সীমা নির্ধারণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ—এসবকে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের একটি প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি সরকারি অর্থের ব্যবহারকে সীমিত ও প্রয়োজনভিত্তিক রাখেন, তাহলে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও একই ধরনের ব্যয়সংযমের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে জাতিসংঘ সফরের মতো আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতেও প্রয়োজন ও ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পায়।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন এক সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দেশের অর্থনীতি নানা চাপের মধ্যে ছিল। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছু মিলিয়ে সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহের চাপ এবং ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের কয়েক মাসের তুলনায় কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় চাপ—এ বাস্তবতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।দেশের অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত। গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলেছে। অনেক শিল্পকারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি। বিদ্যুৎ খাতেও জ্বালানি সরবরাহের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় একাধিক ধাপে বিপুলসংখ্যক নতুন গ্যাসকূপ খনন ও পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভারের কর্মসূচি রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে একাধিক এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ।চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পেও বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।বিদ্যুৎ খাতে কারিগরি ত্রুটি দূর করে উৎপাদন বাড়ানো, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে পর্যায়ক্রমে সৌরশক্তিতে রূপান্তর এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।অর্থাৎ জ্বালানি খাতে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি বহুমুখী জ্বালানি কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।দেশের অর্থনীতির প্রাণ বেসরকারি খাত। শিল্পকারখানা চালু না হলে কর্মসংস্থান বাড়বে না, উৎপাদন বাড়বে না, রাজস্ব আয়ও বাড়বে না। এ কারণে বন্ধ বা সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।প্রধানমন্ত্রী শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের সমস্যাগুলো সরাসরি শুনছেন। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ঋণ, বিনিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা এবং ব্যবসার পরিবেশ—এসব বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।শিল্প খাত সচল হলে এর প্রভাব শুধু উদ্যোক্তাদের ওপর পড়ে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে লাখ লাখ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার। একটি কারখানা চালু হওয়ার অর্থ নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া; উৎপাদন বাড়ার অর্থ সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়া; আর বিনিয়োগ বাড়ার অর্থ অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি হওয়া।এই বাস্তবতা বিবেচনায় বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও সরকারের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের আরও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।এর লক্ষ্য শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়; কৃষক, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর মধ্যে আনা।দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়া এবং সে অনুযায়ী নীতি নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চালুর উদ্যোগও বর্তমান সরকারের বড় সিদ্ধান্তগুলোর একটি। অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য যেমন আর্থিক চ্যালেঞ্জ, তেমনি কর্মচারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের প্রতিটি খাতকে আরও কার্যকর করার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণে কৃচ্ছ্রসাধন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি তাই পরস্পর সম্পর্কিত।দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতি অল্প সময়ে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। অর্থনীতি, জ্বালানি, শিল্প, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে সময় প্রয়োজন। তবে সরকারের দাবি, সাত মাসের মধ্যেই এসব খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের বার্তা নিয়েই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা। সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়ন, মহামারি প্রতিরোধ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হবে।রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটিাধিক আলোচনা ও পার্শ্ব বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন এবং এই সংকটের আন্তর্জাতিক সমাধানের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, জাতিসংঘের অধিবেশন তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে।পাকিস্তান, কানাডা, থাইল্যান্ড, ভুটান, ক্রোয়েশিয়া, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।এসব বৈঠকে শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্য বিনিময় নয়; বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বাস্তব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নিউইয়র্ক সফরটি বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব হয়ে উঠতে পারে।সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উপস্থিতিকে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে কার্যকর কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।একসময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সঙ্গে বড় বহর, দীর্ঘ সফর এবং নানা আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি আলোচনায় থাকত। এবার সেই জায়গায় প্রয়োজনীয় প্রতিনিধিদল, সংক্ষিপ্ত সফর এবং নির্দিষ্ট কূটনৈতিক কর্মসূচিকে সামনে আনা হয়েছে।দেশের ভেতরেও একই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার—রাষ্ট্রীয় অর্থ সীমিত, তাই তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে সেই অর্থ জনগণের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম লক্ষ্য।জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন, সেটি হবে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা একটি দেশ। যে দেশ অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে, শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিচ্ছে।সাত মাসে দীর্ঘদিনের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি নতুন পথরেখা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী সেই বাংলাদেশের কথাই বিশ্বসভায় তুলে ধরবেন—যে বাংলাদেশ সংকটকে অস্বীকার না করে তা মোকাবিলা করতে চায়, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমাতে চায় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সামনে এগিয়ে যেতে চায়।বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের এই নতুন বার্তার মূল সুর হতে পারে—সফর হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ব্যয় হবে জনস্বার্থে এবং কূটনীতির প্রতিটি উদ্যোগের কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশ।