প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬
মুষ্টির চালে দুর্গাপূজা, শেরপুরে নারীদের অনন্য দৃষ্টান্ত
স্টাফ রিপোর্টার ||
এক মুষ্টি চাল, একটু একটু করে সঞ্চয় আর বুকভরা স্বপ্ন এই সামান্য সম্বল নিয়েই শেরপুরে দুর্গাপূজার আয়োজন করছেন আদিবাসী ও দলিত সম্প্রদায়ের একদল নারী। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও অভাব-অনটনকে পেছনে ফেলে নিজেদের উদ্যোগে টানা তৃতীয়বারের মতো এ দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছেন তারা। তাদের এই উদ্যোগে যেমন রয়েছে ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ, তেমনি রয়েছে ঐক্য, আত্মনির্ভরতা ও নারীশক্তির জাগরণের গল্প।শেরপুর পৌর এলাকার সাতানীপাড়া মহল্লায় দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের বসবাস। সংসারের খরচ জোগাতেই যাদের প্রতিদিন লড়াই করতে হয়, সেই নারীরাই স্বপ্ন দেখেছেন নিজেদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা আয়োজনের। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা গড়ে তুলেছেন ‘উমা সংঘ’ নামের একটি সংগঠন। ২৩ সদস্যের এই সংগঠনের সবাই নারী। বছরের শুরুতে মহল্লার ৪২টি পরিবার থেকে তারা প্রতিদিন এক মুষ্টি করে চাল সংগ্রহ করেন। পরে সেই চাল বিক্রি করে টাকা জমা করেন। এভাবে এক বছরে তাদের সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০ হাজার টাকা, যা দিয়ে শুরু হয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। অভাবের সংসারে এক মুষ্টি চাল হয়তো খুব সামান্য, কিন্তু অনেকের সেই ক্ষুদ্র সঞ্চয় একসঙ্গে হয়ে যে বড় স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে, তারই প্রমাণ সাতানীপাড়ার এই নারীরা। নিজেদের উদ্যোগে পূজার আয়োজন করতে পেরে আনন্দিত সংগঠনের সদস্যরা।আয়োজকরা জানান, ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো ছোট পরিসরে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তারা। এরপর ২০২৫ সালে এর ব্যাপ্তি আরেকটু বাড়ে। এবারও আগের দুইবারের চেয়ে বড় পরিসরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। তবে এবার আয়োজন করতে গিয়ে তারা কিছুটা আর্থিক সমস্যায় পড়েন। কারণ, একটি দুর্গাপূজা সম্পন্ন করতে প্রয়োজন কয়েক লাখ টাকা, অথচ সংগঠনের নিজস্ব সঞ্চয় মাত্র ৬০ হাজার টাকা। তাই নিজেদের জমানো অর্থের পাশাপাশি তারা স্থানীয় বিত্তবান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন।সংগৃহীত টাকা দিয়ে শুরুতেই শহরের পালপাড়া থেকে ৬০ হাজার টাকায় দুর্গোৎসবের প্রতিমা কেনা হয়। এরপর অস্থায়ী মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপন করে সাজসজ্জা, তোরণ নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজ নারীরা নিজেরাই করেন। তাদের এই উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। সবার সহযোগিতা ও নিজেদের শ্রমে ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে তাদের স্বপ্নের পূজামণ্ডপ।উমা সংঘের সভাপতি মুক্তি বিশ্বাস বলেন, নারীরা যেন যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন, তা আমরা দেখিয়েছি। পুরুষদের পাশাপাশি সব ক্ষেত্রে নারীরাও যে ভূমিকা রাখতে পারেন, এটি তারই প্রমাণ। প্রথমবার ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার তৃতীয়বারের মতো মায়ের পূজার আয়োজন করেছি। দিন যত যাচ্ছে, আমাদেরও পরিধি বাড়ছে। তবে আমাদের মন্দিরের জায়গাটি অস্থায়ী। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ, যেন আমাদের জন্য স্থায়ী একটি মন্দিরের জায়গা ও ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুমিতা বিশ্বাস বলেন, এ এলাকায় বসবাসকারী সবাই অত্যন্ত দরিদ্র। আমাদের পক্ষে পূজামণ্ডপ তৈরি করা অনেক কঠিন কাজ ছিল, কিন্তু সবাই মিলে তা সম্ভব করেছি। প্রথমে আমরা পূজা করার উদ্যোগ নিই এবং কেবল নারীদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করি। এরপর আমরা প্রতিদিন রান্নার চাল থেকে এক মুষ্টি করে চাল জমাতে শুরু করি। বছর শেষে সেই চাল বিক্রি করেই আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এবার অবশ্য সরকারি কিছু অনুদানও পেয়েছি।স্থানীয় বাসিন্দা ও আদিবাসী নেতা বিদ্বান বিশ্বাস বলেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের নারীরা যেভাবে সাহসের সঙ্গে পূজার আয়োজন করেছেন, তা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। তাদের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। বিশেষ করে এসব নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রশাসনের টেকসই সহযোগিতা কামনা করছি।আরেক আদিবাসী নেতা সুমন্ত বর্মণ বলেন, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও নারীরা যে সাহস ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। নিজেদের উদ্যোগে এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন যে সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে নারীরাও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এই নারীদের পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।জেলা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের সভাপতি জিতেন্দ্র মজুমদার বলেন, উমা সংঘের এই উদ্যোগকে আমরা সবসময় উৎসাহিত করছি। অন্য পূজামণ্ডপের তুলনায় তাদের সরকারি বরাদ্দ কিছুটা বেশি দেওয়া হয়েছে। কারণ তারা শুধু দুর্গাপূজার আয়োজনই করছেন না, এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নারীশক্তির এক অনন্য জাগরণ ঘটাচ্ছেন।
সম্পাদক : এস এ শাহরিয়ার মিল্টন
মাহফুজা প্লাজা, ৫মতলা, শেরপুর শহর , শেরপুর।
প্রয়োজনে : ০১৭১১৬৬৪২১৭ । মেইল : hellosherpurtimes@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ SherpurTimes24 । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত