সারাদেশের ন্যায় ময়মনসিংহ নগরে একদিকে চলছে এসএসসি পরীক্ষা এবং অন্যদিকে সামনে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে শিক্ষার্থীরা। বর্তমান দেশে একযোগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এমন একটি দুর্যোগপূর্ণ ও সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও ময়মনসিংহ নগরের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে আয়োজন করা হচ্ছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার। জনগুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন মেলার আয়োজনে নগরের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা এই মেলার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থী সিনথিয়া আফরিন শিফা তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "পার্কের পাশেই দেখলাম মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আসলে এ সময় এমন আয়োজন দেখে আমরা হতাশ। আমাদের পরীক্ষা চলাকালীন মেলা হলে অনেক সহপাঠীই পড়াশোনা বাদ দিয়ে মেলায় সময় কাটাবে। দেশের এই সংকটের সময় কিভাবে এমন মেলার আয়োজন করা হয়, তা আমার বোধগম্য নয়।"
গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরী হাই স্কুলের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার অন্তরা বলে, "মেলা হলে এমনিতে আমাদের ভালোই লাগে, বন্ধুদের সাথে ঘোরা যায় বা অনেক কিছু কেনা যায়। কিন্তু এই সময়ে মেলা হওয়া মানে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। একদিকে এসএসসি পরীক্ষা চলছে, অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষা সামনে। কর্তৃপক্ষ এই সময়ে মেলা করার অনুমতি কিভাবে দেয়, বুঝতে পারছি না।"
মেলা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী বাবুল হোসেন। তিনি বলেন, "আমাদের সাধারণ মানুষের কথার কোনো দাম নাই। মেলার প্যান্ডেল আর গেইট দেখেই পোলাপান পড়াশোনা ছেড়ে দিছে। এখন মেলা পুরোদমে শুরু হলে আমাদের পরীক্ষার্থী সন্তানদের ফলাফল খারাপ হবে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী একদিকে লেখাপড়ার পরিবেশ ঠিক রাখতে দিনরাত চেষ্টা করছেন, আর এরা এ ধরণের বিনোদনমূলক আয়োজন করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে। আমরা চাই এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন ও এইচএসসি পরীক্ষার আগে যেন কোনো মেলা না হয়। এটা হলে আমাদের সন্তানদের পরীক্ষার ফলাফলে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।"
এ বিষয়ে সমাজকর্মি ও সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, "শিক্ষা ও সংস্কৃতির শহর ময়মনসিংহে এমনিতেই যানজটসহ নানা নাগরিক সংকট বিদ্যমান। তার ওপর পরীক্ষা এবং বিদ্যুৎ জ্বালানী সংকটের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেলার আয়োজন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরণের বাণিজ্যিক আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিচ্যুতি ঘটাবে এবং জনজীবনে অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দেবে। প্রশাসনের উচিত ছিল জনস্বার্থ বিবেচনা করে মেলার অনুমতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা।"
সংকটময় সময়ে মেলার আয়োজন প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ মহানগর সুজন সহ সভাপতি তৌহিদুজ্জামান ছোটন বলেন, "পুরো দেশ যখন বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন মেলার আলোকসজ্জা ও অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।"
মেলার প্রস্তুতি বিষয়ে আয়োজক কমিটির বিকাশ রায় জানান, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলাকালীন মেলা বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের কোনো সংকট না থাকায় এবং সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় ঈদের পূর্বেই মেলা চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
" তবে স্থানীয়দের দাবি, তথাকথিত নিয়ম মেনে আবেদন করলেও বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে এই মেলার আইনি ও নৈতিক কোনো বৈধতা নেই। অভিযোগ উঠেছে, আয়োজক গোষ্ঠীটি প্রভাবশালী মহলের দোহাই দিয়ে মেলাটি চালু করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য জানতে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। পরবর্তীতে মেলা সংক্রান্ত বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধানের কাছে জানতে চাইলে তিনি এক রহস্যজনক মন্তব্য করেন। এডিসি (সার্বিক) বলেন, "মেলা নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই, এটাই আমাদের বক্তব্য।"তবে একইসাথে তিনি মেলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা করার জন্য কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
জয়নুল উদ্যানের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে এমন বিতর্কিত মেলার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে এখন পুরো নগরবাসীর নজর প্রশাসনের দিকে। অভিভাবক,সচেতনমহল ও স্থানীয়দের আশা , ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাজীবন ও রাষ্ট্রীয় সংকট মোকাবিলাকেই প্রশাসন কার্যকারী ভূমিকা নিবে।

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
সারাদেশের ন্যায় ময়মনসিংহ নগরে একদিকে চলছে এসএসসি পরীক্ষা এবং অন্যদিকে সামনে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছে শিক্ষার্থীরা। বর্তমান দেশে একযোগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এমন একটি দুর্যোগপূর্ণ ও সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও ময়মনসিংহ নগরের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে আয়োজন করা হচ্ছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলার। জনগুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন মেলার আয়োজনে নগরের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা এই মেলার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চলতি এসএসসি পরীক্ষার্থী সিনথিয়া আফরিন শিফা তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "পার্কের পাশেই দেখলাম মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আসলে এ সময় এমন আয়োজন দেখে আমরা হতাশ। আমাদের পরীক্ষা চলাকালীন মেলা হলে অনেক সহপাঠীই পড়াশোনা বাদ দিয়ে মেলায় সময় কাটাবে। দেশের এই সংকটের সময় কিভাবে এমন মেলার আয়োজন করা হয়, তা আমার বোধগম্য নয়।"
গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরী হাই স্কুলের শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার অন্তরা বলে, "মেলা হলে এমনিতে আমাদের ভালোই লাগে, বন্ধুদের সাথে ঘোরা যায় বা অনেক কিছু কেনা যায়। কিন্তু এই সময়ে মেলা হওয়া মানে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। একদিকে এসএসসি পরীক্ষা চলছে, অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষা সামনে। কর্তৃপক্ষ এই সময়ে মেলা করার অনুমতি কিভাবে দেয়, বুঝতে পারছি না।"
মেলা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী বাবুল হোসেন। তিনি বলেন, "আমাদের সাধারণ মানুষের কথার কোনো দাম নাই। মেলার প্যান্ডেল আর গেইট দেখেই পোলাপান পড়াশোনা ছেড়ে দিছে। এখন মেলা পুরোদমে শুরু হলে আমাদের পরীক্ষার্থী সন্তানদের ফলাফল খারাপ হবে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী একদিকে লেখাপড়ার পরিবেশ ঠিক রাখতে দিনরাত চেষ্টা করছেন, আর এরা এ ধরণের বিনোদনমূলক আয়োজন করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে। আমরা চাই এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন ও এইচএসসি পরীক্ষার আগে যেন কোনো মেলা না হয়। এটা হলে আমাদের সন্তানদের পরীক্ষার ফলাফলে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।"
এ বিষয়ে সমাজকর্মি ও সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, "শিক্ষা ও সংস্কৃতির শহর ময়মনসিংহে এমনিতেই যানজটসহ নানা নাগরিক সংকট বিদ্যমান। তার ওপর পরীক্ষা এবং বিদ্যুৎ জ্বালানী সংকটের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেলার আয়োজন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরণের বাণিজ্যিক আয়োজন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিচ্যুতি ঘটাবে এবং জনজীবনে অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দেবে। প্রশাসনের উচিত ছিল জনস্বার্থ বিবেচনা করে মেলার অনুমতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা।"
সংকটময় সময়ে মেলার আয়োজন প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ মহানগর সুজন সহ সভাপতি তৌহিদুজ্জামান ছোটন বলেন, "পুরো দেশ যখন বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন মেলার আলোকসজ্জা ও অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত এর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।"
মেলার প্রস্তুতি বিষয়ে আয়োজক কমিটির বিকাশ রায় জানান, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলাকালীন মেলা বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের কোনো সংকট না থাকায় এবং সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় ঈদের পূর্বেই মেলা চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
" তবে স্থানীয়দের দাবি, তথাকথিত নিয়ম মেনে আবেদন করলেও বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে এই মেলার আইনি ও নৈতিক কোনো বৈধতা নেই। অভিযোগ উঠেছে, আয়োজক গোষ্ঠীটি প্রভাবশালী মহলের দোহাই দিয়ে মেলাটি চালু করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য জানতে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। পরবর্তীতে মেলা সংক্রান্ত বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধানের কাছে জানতে চাইলে তিনি এক রহস্যজনক মন্তব্য করেন। এডিসি (সার্বিক) বলেন, "মেলা নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই, এটাই আমাদের বক্তব্য।"তবে একইসাথে তিনি মেলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা করার জন্য কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
জয়নুল উদ্যানের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে এমন বিতর্কিত মেলার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে এখন পুরো নগরবাসীর নজর প্রশাসনের দিকে। অভিভাবক,সচেতনমহল ও স্থানীয়দের আশা , ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাজীবন ও রাষ্ট্রীয় সংকট মোকাবিলাকেই প্রশাসন কার্যকারী ভূমিকা নিবে।

আপনার মতামত লিখুন