বিখ্যাত ক্রিকেট বার্ষিক প্রকাশনা উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক-এর সম্পাদক লরেন্স বুথ ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআইয়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ক্রিকেটকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজের সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তে বুথ অভিযোগ করেছেন, ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন পুরোপুরি হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের একটি ক্রীড়া অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, মাঠের খেলা এখন আর কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ারে রূপ নিয়েছে।
লরেন্স বুথ বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তপ্ত সম্পর্কের প্রভাব ক্রিকেটে পড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। গত বছর কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেশ সরাসরি ক্রিকেট মাঠে দেখা গেছে। ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়কে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি উৎসর্গ করার ঘটনাকে বুথ বিসিসিআই ও সরকারের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের প্রকাশ্য প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সম্পাদকীয়তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়কে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সাথে তুলনা করেছেন। মোদী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন যে খেলার মাঠেও একই ফলাফল এসেছে। বুথ এই মানসিকতার সমালোচনা করে বলেছেন, যেখানে সীমান্তে প্রকৃত যুদ্ধে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, সেখানে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচকে সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সমার্থক করে তোলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং সংবেদনহীন কাজ।
এশিয়া কাপের ফাইনালে দুবাইয়ে যে অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, বুথ সেটিকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভারত শিরোপা জিতলেও তারা মঞ্চে উঠে পুরস্কার নিতে অস্বীকার করে, কারণ ট্রফি তুলে দেওয়ার কথা ছিল এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রধান ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির। ভারতীয় ক্রিকেটারদের এই আচরণকে রাজনৈতিক আজ্ঞাবহতা হিসেবে দেখছেন উইজডেন সম্পাদক। তিনি মনে করেন, যদি পাকিস্তান নিয়ে ভারতের এতই আপত্তি থাকতো তবে তাদের খেলা উচিত ছিল না কিন্তু মাঠে নেমে এমন অপমানজনক আচরণ কেবল লোকদেখানো দেশপ্রেমেরই অংশ।
বুথ তার লেখায় আইসিসি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত যখন পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে অস্বীকার করল, তখন তাদের দাবি মেনে নিয়ে নিরপেক্ষ ভেন্যুর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে যখন বাংলাদেশ তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কারণে ভারতের বাইরে ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছিল, তখন আইসিসি সেটি প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে নাম সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, যা ক্রিকেটের অপশাসনে ভারতের আধিপত্যকেই ফুটিয়ে তোলে।
আইপিএলে বাংলাদেশের বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিও বাদ পড়েনি লরেন্স বুথের ক্ষুরধার লেখনী থেকে। মোস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে তিনি বিসিসিআই-এর একটি ‘প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বুথের মতে, বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় ক্রিকেটীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা স্পষ্টতই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।
গোটা পরিস্থিতিকে ‘অরওয়েলীয়’ বা চরম নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে বুথ বলেছেন যে ক্রিকেটের বর্তমান শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক হয়ে উঠেছে। ভারত যা চায় তাই হয়, আর তুলনামূলক দুর্বল দেশগুলোকে লড়তে হয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ক্রিকেটের এই রাজনৈতিক বিষক্রিয়া নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা আজ নীরব। অথচ এই নীরবতাই খেলাটির মূল স্পিরিট বা আত্মাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
লরেন্স বুথ সতর্ক করে দিয়েছেন, ক্রিকেট ঐতিহাসিকভাবে বাস্তব জগতের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন না হলেও বর্তমানের মতো এত নগ্নভাবে আগে কখনো ব্যবহৃত হয়নি। খেলাটির ভবিষ্যৎ এখন রাজনীতির দাবার ছকে বন্দি হয়ে পড়েছে।

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬
বিখ্যাত ক্রিকেট বার্ষিক প্রকাশনা উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাক-এর সম্পাদক লরেন্স বুথ ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআইয়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ক্রিকেটকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজের সাম্প্রতিক সম্পাদকীয়তে বুথ অভিযোগ করেছেন, ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখন পুরোপুরি হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের একটি ক্রীড়া অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, মাঠের খেলা এখন আর কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ারে রূপ নিয়েছে।
লরেন্স বুথ বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তপ্ত সম্পর্কের প্রভাব ক্রিকেটে পড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন। গত বছর কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেশ সরাসরি ক্রিকেট মাঠে দেখা গেছে। ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়কে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি উৎসর্গ করার ঘটনাকে বুথ বিসিসিআই ও সরকারের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের প্রকাশ্য প্রমাণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সম্পাদকীয়তে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়কে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সাথে তুলনা করেছেন। মোদী সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন যে খেলার মাঠেও একই ফলাফল এসেছে। বুথ এই মানসিকতার সমালোচনা করে বলেছেন, যেখানে সীমান্তে প্রকৃত যুদ্ধে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, সেখানে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচকে সেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সমার্থক করে তোলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং সংবেদনহীন কাজ।
এশিয়া কাপের ফাইনালে দুবাইয়ে যে অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, বুথ সেটিকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ভারত শিরোপা জিতলেও তারা মঞ্চে উঠে পুরস্কার নিতে অস্বীকার করে, কারণ ট্রফি তুলে দেওয়ার কথা ছিল এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রধান ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভির। ভারতীয় ক্রিকেটারদের এই আচরণকে রাজনৈতিক আজ্ঞাবহতা হিসেবে দেখছেন উইজডেন সম্পাদক। তিনি মনে করেন, যদি পাকিস্তান নিয়ে ভারতের এতই আপত্তি থাকতো তবে তাদের খেলা উচিত ছিল না কিন্তু মাঠে নেমে এমন অপমানজনক আচরণ কেবল লোকদেখানো দেশপ্রেমেরই অংশ।
বুথ তার লেখায় আইসিসি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারত যখন পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে অস্বীকার করল, তখন তাদের দাবি মেনে নিয়ে নিরপেক্ষ ভেন্যুর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে যখন বাংলাদেশ তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কারণে ভারতের বাইরে ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছিল, তখন আইসিসি সেটি প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে নাম সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, যা ক্রিকেটের অপশাসনে ভারতের আধিপত্যকেই ফুটিয়ে তোলে।
আইপিএলে বাংলাদেশের বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিও বাদ পড়েনি লরেন্স বুথের ক্ষুরধার লেখনী থেকে। মোস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে তিনি বিসিসিআই-এর একটি ‘প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বুথের মতে, বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় ক্রিকেটীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা স্পষ্টতই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।
গোটা পরিস্থিতিকে ‘অরওয়েলীয়’ বা চরম নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে বুথ বলেছেন যে ক্রিকেটের বর্তমান শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক হয়ে উঠেছে। ভারত যা চায় তাই হয়, আর তুলনামূলক দুর্বল দেশগুলোকে লড়তে হয় প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ক্রিকেটের এই রাজনৈতিক বিষক্রিয়া নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা আজ নীরব। অথচ এই নীরবতাই খেলাটির মূল স্পিরিট বা আত্মাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
লরেন্স বুথ সতর্ক করে দিয়েছেন, ক্রিকেট ঐতিহাসিকভাবে বাস্তব জগতের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন না হলেও বর্তমানের মতো এত নগ্নভাবে আগে কখনো ব্যবহৃত হয়নি। খেলাটির ভবিষ্যৎ এখন রাজনীতির দাবার ছকে বন্দি হয়ে পড়েছে।

আপনার মতামত লিখুন