কম্বোডিয়ায় ক্যাসিনোতে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার শত শত যুবককে সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। দালালদের খপ্পরে পড়ে একেকটি পরিবার ৯ থেকে ১৪ লক্ষ টাকা খুইয়ে এখন পথে বসার উপক্রম।
প্রতিদিন অসংখ্য ভুক্তভোগী প্রতিকারের আশায় গজারিয়া থানায় ভিড় করছেন। শুধুমাত্র শনিবারই অন্তত ১০ জন ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ নিয়ে গিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতারণার ধরন সব ক্ষেত্রে প্রায় একই। আকর্ষণীয় বেতনের কথা বলে প্রথমে যুবকদের আকৃষ্ট করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে ৬ থেকে ৭ লক্ষ টাকা নিয়ে এক বছর মেয়াদী ভিসার কথা বলে পাঠানো হয় কম্বোডিয়ায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় আসল বিভীষিকা। বিমানবন্দরে নামার পর এক দালাল তাদের অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। এভাবে অনেককে ৪-৫ বার পর্যন্ত হাতবদল করা হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, সেখানে যাওয়ার পর দেখা যায় তাদের এক বছর নয় বরং মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসা দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কাজ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারকে দেখিয়ে এবং স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে আরও লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
কম্বোডিয়ায় দালাল চক্রের হাতে আটকে পড়া গজারিয়ায় তরুণ মেহেদী হাসান অভি মোবাইলে জানান, এখানে আসার পর এক দালাল আমাদের অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। এভাবে অনেকেই চার-পাঁচবার বিক্রি হয়েছে। কাজ না দিয়ে রুমে আটকে রেখে মারধর করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আনতে বাধ্য করা হয়। কথা না শুনলে মারধর করে ভিডিও করা হয় এবং জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রাখা হয়।
দালাল চক্রের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সম্প্রতি দেশে ফেরা ভিটিকান্দি গ্রামের তরুণ লাজিম প্রধান তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘মাসিক এক লক্ষ টাকা বেতনের কথা বলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি আমরা বন্দি। এক মাসের ভিজিট ভিসায় নিয়ে গিয়ে আমাদের আটকে রাখা হয়। পরে দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে দেশে ফিরেছি।’
একই করুণ চিত্র ফুটে ওঠে সিএনজি চালক শফিকের আর্তনাদে। তিনি জানান, ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় সুদে টাকা এনে দালালদের ৯ লক্ষ টাকা দিয়েছেন। এখন তার ছেলে রিক্ত হস্তে দেশে ফিরেছে আর তিনি ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পথে বসেছেন।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট হিসেবে মারুফ, রাজন, সাকের, রাহিমা বেগম, আকাশ ও রিফাতসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
অভিযুক্তদের একজন মারুফ দাবি করেন, তারা কাউকে কম্বোডিয়ায় যেতে বাধ্য করেননি, কাজ না পেয়ে সম্প্রতি দেশে ফেরা কয়েকজনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাসান আলী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদন্ত করছি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতারণা থেকে বাঁচতে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিদেশগামীদের প্রতি আহ্বান আপনারা অবশ্যই বৈধ প্রক্রিয়া এবং নিয়ম-কানুন জেনে বিদেশে যাবেন। দালালের খপ্পর থেকে বাঁচতে চোখ-কান খোলা রাখা জরুরি।’
বিষয় : চাকরির ফাঁদ

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬
কম্বোডিয়ায় ক্যাসিনোতে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার শত শত যুবককে সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। দালালদের খপ্পরে পড়ে একেকটি পরিবার ৯ থেকে ১৪ লক্ষ টাকা খুইয়ে এখন পথে বসার উপক্রম।
প্রতিদিন অসংখ্য ভুক্তভোগী প্রতিকারের আশায় গজারিয়া থানায় ভিড় করছেন। শুধুমাত্র শনিবারই অন্তত ১০ জন ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ নিয়ে গিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতারণার ধরন সব ক্ষেত্রে প্রায় একই। আকর্ষণীয় বেতনের কথা বলে প্রথমে যুবকদের আকৃষ্ট করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে ৬ থেকে ৭ লক্ষ টাকা নিয়ে এক বছর মেয়াদী ভিসার কথা বলে পাঠানো হয় কম্বোডিয়ায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই শুরু হয় আসল বিভীষিকা। বিমানবন্দরে নামার পর এক দালাল তাদের অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। এভাবে অনেককে ৪-৫ বার পর্যন্ত হাতবদল করা হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, সেখানে যাওয়ার পর দেখা যায় তাদের এক বছর নয় বরং মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসা দিয়ে পাঠানো হয়েছে। কাজ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও পরিবারকে দেখিয়ে এবং স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে আরও লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
কম্বোডিয়ায় দালাল চক্রের হাতে আটকে পড়া গজারিয়ায় তরুণ মেহেদী হাসান অভি মোবাইলে জানান, এখানে আসার পর এক দালাল আমাদের অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। এভাবে অনেকেই চার-পাঁচবার বিক্রি হয়েছে। কাজ না দিয়ে রুমে আটকে রেখে মারধর করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আনতে বাধ্য করা হয়। কথা না শুনলে মারধর করে ভিডিও করা হয় এবং জোরপূর্বক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রাখা হয়।
দালাল চক্রের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সম্প্রতি দেশে ফেরা ভিটিকান্দি গ্রামের তরুণ লাজিম প্রধান তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘মাসিক এক লক্ষ টাকা বেতনের কথা বলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি আমরা বন্দি। এক মাসের ভিজিট ভিসায় নিয়ে গিয়ে আমাদের আটকে রাখা হয়। পরে দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে দেশে ফিরেছি।’
একই করুণ চিত্র ফুটে ওঠে সিএনজি চালক শফিকের আর্তনাদে। তিনি জানান, ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় সুদে টাকা এনে দালালদের ৯ লক্ষ টাকা দিয়েছেন। এখন তার ছেলে রিক্ত হস্তে দেশে ফিরেছে আর তিনি ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে পথে বসেছেন।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এই চক্রের সাথে সংশ্লিষ্ট হিসেবে মারুফ, রাজন, সাকের, রাহিমা বেগম, আকাশ ও রিফাতসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
অভিযুক্তদের একজন মারুফ দাবি করেন, তারা কাউকে কম্বোডিয়ায় যেতে বাধ্য করেননি, কাজ না পেয়ে সম্প্রতি দেশে ফেরা কয়েকজনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাসান আলী বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদন্ত করছি এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতারণা থেকে বাঁচতে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বিদেশগামীদের প্রতি আহ্বান আপনারা অবশ্যই বৈধ প্রক্রিয়া এবং নিয়ম-কানুন জেনে বিদেশে যাবেন। দালালের খপ্পর থেকে বাঁচতে চোখ-কান খোলা রাখা জরুরি।’

আপনার মতামত লিখুন