কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে সরকারি নিষেধ অমান্য করে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। মাছ ধরার জন্য নদী ইজারা নেওয়ার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে ফসলি জমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভাঙনের আশঙ্কা করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও মিলছে না কোনো প্রতিকার।
জানা যায়, উপজেলার বালিখোলা ফেরিঘাট সংলগ্ন সূতারপাড়া গ্রামের সামনে ধনু নদীতে মাসের পর মাস ধরে চলছে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন। সরকারের কাছ থেকে নদী ইজারা নেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল মাছ ধরার পাশাপাশি অন্তত পাঁচটি ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন ব্যাপক পরিমাণ বালু উত্তোলন করছে। ফলে সূতারপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে এবং ফসলি জমিতে বড় গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত নৌকায় করে নদী থেকে বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, বর্ষা শেষে নদীর তীরের জমিতে তারা আলু, ভুট্টা ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন। কিন্তু অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে এসব জমি দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় তারা হতাশ ও আতঙ্কিত।
ভুক্তভোগী কৃষক মানিক মিয়া বলেন, ‘প্রভাবশালীর একটি চক্র ইতোমধ্যে আমাদের প্রায় ৫০ একর জমি দখল করে নিয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হচ্ছে, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা এ কর্মকাণ্ডে জড়িত।’
নদীপাড়ের বাসিন্দারা নূরুজ্জামান বলেব,‘বর্তমানে প্রভাবশালী একটি মহল রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে। তারা নদী ইজারা নেওয়ার নামে মূলত নিজেদের লাভের জন্য অপরিকল্পিতভাবে বালু তুলছে। আমরা এই কাজে বাধা দিলেও তারা তা মানছে না; বরং তারা শক্তিশালী ও বিত্তবান হওয়ায় আমরা সাধারণ গ্রামবাসী তাদের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বালু উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গ্রামের মানুষের হাতে এখন আর তেমন জমি-জিরাত অবশিষ্ট নেই। আগে নদীর পাড় ঘেঁষে আলু, ভুট্টা ও মরিচের ভালো ফলন হতো, যা দিয়ে মানুষের সংসার চলত। কিন্তু সব জমি নদী কেড়ে নেওয়ায় এখন গ্রামবাসীরা চরম খাদ্য সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছে।’
মোহাম্মদ আশরাফ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটার ফলে আমাদের বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে, তাতে খুব দ্রুতই আমাদের ঘরবাড়িও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ড্রেজারের এই অবৈধ কার্যক্রম আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। আমরা এর আগেও বহুবার অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে পুরো গ্রামটিই চরম বিপদের মুখে পড়বে।’
ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েও কোনো ন্যায্য বিচার পাইনি। বিগত কয়েক মাস ধরেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে, কিন্তু সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এভাবে প্রতি বছর যদি গ্রাম থেকে যদি ১০০ থেকে ২০০ ফুট করে ভাঙতে থাকে, তবে ২০ হাজার মানুষের এই জনপদ খুব দ্রুতই মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত, তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই সাধারণ গ্রামবাসীদের পক্ষে এককভাবে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমরা ইতোপূর্বে অনেক মানববন্ধন করেছি, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আমাদের সেই প্রতিবাদ প্রশাসনের কানে পৌঁছায় না।আমরা আজ অসহায়। একমাত্র সরকারের পক্ষ থেকেই এই ধ্বংসযজ্ঞ রোধ করা সম্ভব।’
সুতারপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি মো. জাহিদুর হক বলেন, ‘এখানে নদী থেকে মাছ ধরার জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল মাছ ধরার জন্য। কিন্তু শর্ত অমান্য করে মাছ ধরার আড়ালে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। যারা মূলত নদী শাসনের দায়িত্বে আছেন, তারাই এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আমাদের গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ আজ চরম ঝুঁকির মুখে। আমরা এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের স্থায়ী প্রতিকার চাই এই মানুষের জান-মাল রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
এ বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে পরিবেশের ক্ষতি করা হলে প্রশাসন কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে সরকারি নিষেধ অমান্য করে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে। মাছ ধরার জন্য নদী ইজারা নেওয়ার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলায় নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে ফসলি জমি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভাঙনের আশঙ্কা করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও মিলছে না কোনো প্রতিকার।
জানা যায়, উপজেলার বালিখোলা ফেরিঘাট সংলগ্ন সূতারপাড়া গ্রামের সামনে ধনু নদীতে মাসের পর মাস ধরে চলছে অবৈধ ভাবে বালু উত্তোলন। সরকারের কাছ থেকে নদী ইজারা নেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল মাছ ধরার পাশাপাশি অন্তত পাঁচটি ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন ব্যাপক পরিমাণ বালু উত্তোলন করছে। ফলে সূতারপাড়াসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে এবং ফসলি জমিতে বড় গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত নৌকায় করে নদী থেকে বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, বর্ষা শেষে নদীর তীরের জমিতে তারা আলু, ভুট্টা ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন। কিন্তু অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে এসব জমি দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় তারা হতাশ ও আতঙ্কিত।
ভুক্তভোগী কৃষক মানিক মিয়া বলেন, ‘প্রভাবশালীর একটি চক্র ইতোমধ্যে আমাদের প্রায় ৫০ একর জমি দখল করে নিয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হচ্ছে, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা এ কর্মকাণ্ডে জড়িত।’
নদীপাড়ের বাসিন্দারা নূরুজ্জামান বলেব,‘বর্তমানে প্রভাবশালী একটি মহল রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে। তারা নদী ইজারা নেওয়ার নামে মূলত নিজেদের লাভের জন্য অপরিকল্পিতভাবে বালু তুলছে। আমরা এই কাজে বাধা দিলেও তারা তা মানছে না; বরং তারা শক্তিশালী ও বিত্তবান হওয়ায় আমরা সাধারণ গ্রামবাসী তাদের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বালু উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গ্রামের মানুষের হাতে এখন আর তেমন জমি-জিরাত অবশিষ্ট নেই। আগে নদীর পাড় ঘেঁষে আলু, ভুট্টা ও মরিচের ভালো ফলন হতো, যা দিয়ে মানুষের সংসার চলত। কিন্তু সব জমি নদী কেড়ে নেওয়ায় এখন গ্রামবাসীরা চরম খাদ্য সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছে।’
মোহাম্মদ আশরাফ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটার ফলে আমাদের বিঘার পর বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে, তাতে খুব দ্রুতই আমাদের ঘরবাড়িও নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ড্রেজারের এই অবৈধ কার্যক্রম আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। আমরা এর আগেও বহুবার অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে দেখিনি। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে পুরো গ্রামটিই চরম বিপদের মুখে পড়বে।’
ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েও কোনো ন্যায্য বিচার পাইনি। বিগত কয়েক মাস ধরেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে, কিন্তু সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এভাবে প্রতি বছর যদি গ্রাম থেকে যদি ১০০ থেকে ২০০ ফুট করে ভাঙতে থাকে, তবে ২০ হাজার মানুষের এই জনপদ খুব দ্রুতই মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত, তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই সাধারণ গ্রামবাসীদের পক্ষে এককভাবে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমরা ইতোপূর্বে অনেক মানববন্ধন করেছি, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আমাদের সেই প্রতিবাদ প্রশাসনের কানে পৌঁছায় না।আমরা আজ অসহায়। একমাত্র সরকারের পক্ষ থেকেই এই ধ্বংসযজ্ঞ রোধ করা সম্ভব।’
সুতারপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি মো. জাহিদুর হক বলেন, ‘এখানে নদী থেকে মাছ ধরার জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল মাছ ধরার জন্য। কিন্তু শর্ত অমান্য করে মাছ ধরার আড়ালে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। যারা মূলত নদী শাসনের দায়িত্বে আছেন, তারাই এই অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আমাদের গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ আজ চরম ঝুঁকির মুখে। আমরা এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের স্থায়ী প্রতিকার চাই এই মানুষের জান-মাল রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
এ বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে পরিবেশের ক্ষতি করা হলে প্রশাসন কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

আপনার মতামত লিখুন