শেরপুর     শনিবার, ০২ মে ২০২৬
 ‍SherpurTimes24

বন্যহাতির লোকালয়ে হানা , ফসল বাঁচাতে নির্ঘুম কৃষক



বন্যহাতির লোকালয়ে হানা , ফসল বাঁচাতে নির্ঘুম  কৃষক
ছবি: প্রতিনিধি

শেরপুর সীমান্তে সন্ধ্যা নামলেই বন থেকে হাতির দল লোকালয়ে এসে সাবাড় করছে ক্ষেতের ধান। হানা দিচ্ছে বাড়িঘর ও বাগানে। বন্যহাতির কবল থেকে ফসল বাঁচাতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেকেই কেটে ফেলছেন আধাপাকা ধান।

পাহাড়ী এলাকার কৃষকরা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে প্রতিনিয়তই ধান ক্ষেতে নেমে আসছে বন্যহাতির দল। গত দুই সপ্তাহ ধরে শতাধিক বন্যহাতি একাধিক দলে ভাগ হয়ে গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকার ধানক্ষেতে হানা দিচ্ছে। পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করছে ক্ষেত। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবাসীরা।

হাতি তাড়াতে কেরোসিন দিয়ে মশাল জালিয়ে ও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।


এদিকে, বোরোধান কাটার মৌসুম সামনেই। এই সময়ে দ্বিগুণ বেড়েছে বন্যহাতির তান্ডব। প্রায় প্রতিদিনই বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় খাবারের সন্ধানে অরণ্য থেকে ধান ক্ষেতে দলবেঁধে নেমে আসছে হাতিরা। ফসল রক্ষা করতে ধানক্ষেতে টঙ ঘর বানিয়ে রাতদিন পাহাড়া দিচ্ছেন কৃষকেরা। ফসল ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে বন্যহাতির অত্যাচার বেড়েছে দ্বিগুণ। কোনভাবেই ক্ষুধার্ত হাতিগুলোকে দমানো যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার কৃষকরা ইতোমধ্যে আধাপাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন।

ঝিনাইগাতী উপজেলার গান্ধীগাও এলাকার কৃষক মোস্তফা কামাল বলেছেন, ‘আমি ধারদেনা করে অনেক কষ্টে ইরিধান চাষ করেছিলাম। হাতি আমার সব শেষ করে দিছে। সারা বছর কী খাব, আর ধারদেনাই পরিশোধ করব কীভাবে?’

ষাটোর্ধ কৃষাণী মতিজান বিবি বললেন, ‘স্বামী নাই, পোলাডারে (ছেলে) নিয়ে থাহি (থাকি)। কত কষ্ট কইরা আবাদ করলাম, হাতি তো সব শেষ কইরা দিলো। এহন আমগোর (আমাদের) কি অইবো। সরকার একডা ব্যবস্থা করুক। হাতি হাতির জাগায় থাহুক। আমরা আমগোর জাগায় থাহি।’

নালিতাবাড়ী উপজেলার আন্ধারুপাড়া গ্রামের গারো আদিবাসী কৃষক মেজেস সাংমা বলেছেন, ‘ফসল বাঁচাতে আমরা খেতের পাশে টঙ ঘর বানিয়ে রাতদিন পাহাড়া দেই। আমরা চিৎকার, হৈ-হুল্লোড় করে, টিন পিটিয়ে শব্দ করে আবার কখনো মশাল জ্বালিয়ে থাকি। কিন্তু বর্তমানে কেরোসিন তেলের সরবরাহ কম থাকায় ও দাম বেশি হওয়ায় হাতি তাড়াতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি জানান, বনবিভাগ থেকে ফসলের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও তা সবাই পায় না। বিশেষ করে জমির কাগজপত্রের কারণে বর্গাচাষীরা ক্ষতিপূরণ পান না। তাছাড়া ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় ক্ষতিপূরণ কম পাওয়া যায়।

দাওধারা গ্রামের কৃষক মো. হালিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, বন্যহাতি যা ক্ষতি করে সরকার তার চারভাগের একভাগও ক্ষতিপূরণ দেয় না। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি আরো সহজ করা দরকার। এছাড়া হাতি আক্রান্ত এলাকায় উচ্চ শক্তি সম্পন্ন আলো জ্বালানোর দাবিও জানান তিনি।

পরিবেশবাদী সংগঠন শাইন-এর নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিক মুগনিউর রহমান মনি বলেন , ‘আমরা অনেক আগে থেকেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি করে আসছি আমরা। শুধু কথাই দেওয়া হয়, বাস্তবায়ন করা হয়না।’

ময়মনসিংহ বন বিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক এসবি তানভীর আহমেদ ইমন জানান, গারো পাহাড়ে হাতির পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও হতাহতদের সরকারের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। একইসাথে বন্যহাতি ও মানুষের মাঝে সহাবস্থানের জন্য আমরা এলাকার মানুষদেরকে সচেতন করছি। কৃষক যাতে সহজে তাদের ক্ষতিপূরণ পায় সে বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।’

সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বলেছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয়ভাবে যে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, তা সাময়িক। আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বনমন্ত্রীর নিকট বিষয়টি জানিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়তই সংসদে কথা বলে যাচ্ছি। আশা করছি দ্রুত সময়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সরকার। তিনটি উপায় নিয়ে আমরা সামনে এগোতে চাই, অভয়ারণ্য, হাতির খাদ্যের ও পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং সোলার ফেন্সিং বা সৌর বেড়ার ব্যবস্থা করা।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্যহাতির আক্রমণে কেউ নিহত হলে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ ও ফসলের ক্ষতির জন্য ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সরকার।

প্রসঙ্গত, ভারতের সীমান্তঘেঁষা জেলা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ গারো পাহাড় এলাকায় প্রায় ৩০ বছর আগে থেকেই চলছে হাতির উপদ্রব। এরপর থেকে প্রতি বছরই ফসলের মৌসুমে লোকালয়ে নেমে এসে হানা দেয় বন্যহাতির দল। বিভিন্ন সময়ে হাতি তাড়াতে গিয়ে মারা গেছেন কৃষক, আবার মৃত্যু হয়েছে হাতিরও।

আপনার মতামত লিখুন

 ‍SherpurTimes24

শনিবার, ০২ মে ২০২৬


বন্যহাতির লোকালয়ে হানা , ফসল বাঁচাতে নির্ঘুম কৃষক

প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

শেরপুর সীমান্তে সন্ধ্যা নামলেই বন থেকে হাতির দল লোকালয়ে এসে সাবাড় করছে ক্ষেতের ধান। হানা দিচ্ছে বাড়িঘর ও বাগানে। বন্যহাতির কবল থেকে ফসল বাঁচাতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। অনেকেই কেটে ফেলছেন আধাপাকা ধান।

পাহাড়ী এলাকার কৃষকরা জানান, চলতি বোরো মৌসুমে প্রতিনিয়তই ধান ক্ষেতে নেমে আসছে বন্যহাতির দল। গত দুই সপ্তাহ ধরে শতাধিক বন্যহাতি একাধিক দলে ভাগ হয়ে গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকার ধানক্ষেতে হানা দিচ্ছে। পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করছে ক্ষেত। এতে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্তবাসীরা।

হাতি তাড়াতে কেরোসিন দিয়ে মশাল জালিয়ে ও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।


এদিকে, বোরোধান কাটার মৌসুম সামনেই। এই সময়ে দ্বিগুণ বেড়েছে বন্যহাতির তান্ডব। প্রায় প্রতিদিনই বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় খাবারের সন্ধানে অরণ্য থেকে ধান ক্ষেতে দলবেঁধে নেমে আসছে হাতিরা। ফসল রক্ষা করতে ধানক্ষেতে টঙ ঘর বানিয়ে রাতদিন পাহাড়া দিচ্ছেন কৃষকেরা। ফসল ঘরে তোলার আগ মুহূর্তে বন্যহাতির অত্যাচার বেড়েছে দ্বিগুণ। কোনভাবেই ক্ষুধার্ত হাতিগুলোকে দমানো যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার কৃষকরা ইতোমধ্যে আধাপাকা ধান কাটতে শুরু করেছেন।

ঝিনাইগাতী উপজেলার গান্ধীগাও এলাকার কৃষক মোস্তফা কামাল বলেছেন, ‘আমি ধারদেনা করে অনেক কষ্টে ইরিধান চাষ করেছিলাম। হাতি আমার সব শেষ করে দিছে। সারা বছর কী খাব, আর ধারদেনাই পরিশোধ করব কীভাবে?’

ষাটোর্ধ কৃষাণী মতিজান বিবি বললেন, ‘স্বামী নাই, পোলাডারে (ছেলে) নিয়ে থাহি (থাকি)। কত কষ্ট কইরা আবাদ করলাম, হাতি তো সব শেষ কইরা দিলো। এহন আমগোর (আমাদের) কি অইবো। সরকার একডা ব্যবস্থা করুক। হাতি হাতির জাগায় থাহুক। আমরা আমগোর জাগায় থাহি।’

নালিতাবাড়ী উপজেলার আন্ধারুপাড়া গ্রামের গারো আদিবাসী কৃষক মেজেস সাংমা বলেছেন, ‘ফসল বাঁচাতে আমরা খেতের পাশে টঙ ঘর বানিয়ে রাতদিন পাহাড়া দেই। আমরা চিৎকার, হৈ-হুল্লোড় করে, টিন পিটিয়ে শব্দ করে আবার কখনো মশাল জ্বালিয়ে থাকি। কিন্তু বর্তমানে কেরোসিন তেলের সরবরাহ কম থাকায় ও দাম বেশি হওয়ায় হাতি তাড়াতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি জানান, বনবিভাগ থেকে ফসলের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও তা সবাই পায় না। বিশেষ করে জমির কাগজপত্রের কারণে বর্গাচাষীরা ক্ষতিপূরণ পান না। তাছাড়া ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় ক্ষতিপূরণ কম পাওয়া যায়।

দাওধারা গ্রামের কৃষক মো. হালিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, বন্যহাতি যা ক্ষতি করে সরকার তার চারভাগের একভাগও ক্ষতিপূরণ দেয় না। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি আরো সহজ করা দরকার। এছাড়া হাতি আক্রান্ত এলাকায় উচ্চ শক্তি সম্পন্ন আলো জ্বালানোর দাবিও জানান তিনি।

পরিবেশবাদী সংগঠন শাইন-এর নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিক মুগনিউর রহমান মনি বলেন , ‘আমরা অনেক আগে থেকেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি করে আসছি আমরা। শুধু কথাই দেওয়া হয়, বাস্তবায়ন করা হয়না।’

ময়মনসিংহ বন বিভাগের সহকারী বনসংরক্ষক এসবি তানভীর আহমেদ ইমন জানান, গারো পাহাড়ে হাতির পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও হতাহতদের সরকারের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। একইসাথে বন্যহাতি ও মানুষের মাঝে সহাবস্থানের জন্য আমরা এলাকার মানুষদেরকে সচেতন করছি। কৃষক যাতে সহজে তাদের ক্ষতিপূরণ পায় সে বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।’

সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বলেছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয়ভাবে যে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, তা সাময়িক। আমরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বনমন্ত্রীর নিকট বিষয়টি জানিয়েছি। বিষয়টি নিয়ে প্রতিনিয়তই সংসদে কথা বলে যাচ্ছি। আশা করছি দ্রুত সময়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সরকার। তিনটি উপায় নিয়ে আমরা সামনে এগোতে চাই, অভয়ারণ্য, হাতির খাদ্যের ও পানির স্থায়ী ব্যবস্থা এবং সোলার ফেন্সিং বা সৌর বেড়ার ব্যবস্থা করা।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্যহাতির আক্রমণে কেউ নিহত হলে ৩ লাখ, আহত হলে ১ লাখ ও ফসলের ক্ষতির জন্য ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে সরকার।

প্রসঙ্গত, ভারতের সীমান্তঘেঁষা জেলা শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ণ গারো পাহাড় এলাকায় প্রায় ৩০ বছর আগে থেকেই চলছে হাতির উপদ্রব। এরপর থেকে প্রতি বছরই ফসলের মৌসুমে লোকালয়ে নেমে এসে হানা দেয় বন্যহাতির দল। বিভিন্ন সময়ে হাতি তাড়াতে গিয়ে মারা গেছেন কৃষক, আবার মৃত্যু হয়েছে হাতিরও।


 ‍SherpurTimes24


কপিরাইট © ২০২৬ ‍SherpurTimes24 । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত