শেরপুরে শতাধিক এলাকায় বসছে 'বৈশাখী মেলা'
গ্রামীণ লোকজ সমাজ বারবার নিজেদের মতো বরণ করে নেয় বৈশাখকে। আর প্রতিবছরের ন্যায় শেরপুরে ১৪ এপ্রিল বা বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখে সেজে ওঠে বাঙালিয়ানায়। শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে বসে বৈশাখী মেলা। সারা দেশের মতো শেরপুরে প্রায় শতাধিক গ্রাম বা হাটবাজারে বসে এ বৈশাখী মেলা। এ উপলক্ষে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই উৎসবের আমেজ বিরাজ করে । মেলায় দোকানিরা দু’একদিন আগে এসেই স্ব-স্ব দোকানের জায়গা নিয়ে বসেন। আবার কোনো কোনো স্থানের দোকানি পয়লা বৈশাখের আগের রাতে পসরা সাজানোর কাজ শুরু করেন। স্থানীয়রা জানায়, শুধু বৈশাখ মাস নয় চৈত্র মাস শুরু হওয়ার পর থেকেই জেলার বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জের ছোট ছোট হাট বাজারগুলোতে মেলা বসে। এই মেলাকেও বৈশাখী মেলা হিসেবে মনে করেন স্থানীয়রা। ইতিমধ্যে গত ২০ ও ২১ চৈত্র জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার কালিবাড়ি হাই স্কুল মাঠে এবং মালিঝিকান্দা ইউনিয়নের তিনআনি বাজারের বসে বৈশাখী মেলা। অর্থাৎ বৈশাখী মেলা বৈশাখ মাসে বসলেও চৈত্র মাসের যেসব মেলা অনুষ্ঠিত হয় সে মেলা গুলোকেও স্থানীয়রা বৈশাখী মেলা হিসেবে উদযাপন করে থাকে। তবে চৈত্র সংক্রান্তি হিসেবেও কিছু মেলা বসে সেগুলো শুধুমাত্র চৈত্র সংক্রান্ত দিনে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়।বৈশাখী মেলায় বিভিন্ন আসবাবপত্রের দোকানিদের পাশাপাশি মুড়ি-মুরকি, সাজ, মুড়ি ও তিলের মোয়া, লাড়ু, স্থানীয়ভাবে হাতে তৈরি বিস্কুট, বাদাম, বুট ভাজা, পেঁয়াজু, নারিকেলের তক্তি, গজাসহ বিভিন্ন মিষ্টি এবং মুখরোচক খাবার প্রস্তুতকারীরাও বসে নেই। তারাও দিনরাত খেটে তৈরি করছে এসব খাবার। মেলা শুরু হওয়ার সাত দিন আগেই বিভিন্ন স্থানের পাইকার এসে এসব খাবার কিনে নিয়ে যায় বলে জানালেন খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকারীরা।মেলায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রির পাশাপাশি মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজস ও খেলনা তৈরির কারিগর মৃৎশিল্পীরাও ব্যস্ত সময় পার করে বৈশাখের আগে আগে । তারাও বছরে একবার বাড়তি আয়ের জন্য মাটি দিয়ে বিভিন্ন খেলনা, শো-পিস, গয়না, বাঁশ ও মাটির তৈরি তৈজসপত্র তৈরি করে মজুত করে রাখেন। কারণ, মেলা শুরু হওয়ার সাত থেকে ১৫ দিন আগে এসব পণ্য বিক্রি শুরু হয় বলে জানালেন শহরের বয়ড়া পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।স্থানীয় বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রতি বছর প্রায় শতাধিক স্থানে বা গ্রামে এ বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এসব মেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান হলো: সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের বটতলী বাজার ও কামারিয়া ইউনিয়নের ঘুষের মাঠে, তিরসা, সূর্যোদী, ইমামবাড়ী বাজার, ভীমগঞ্জ বাজার, বাকেরকান্দা, তিলকান্দি, গাজিরখামার ইউনিয়নের গাজিরখামার বাজার, ধলা ও ভাতশালা ইউনিয়নের চন্দেরনগর, সাপমারি, কূঠুড়াকান্দা, ছনকান্দা।নকলা উপজেলার নকলা হাইস্কুল মাঠ, গনপদ্দি হাইস্কুল মাঠ, টালকি, পাঠাকাটা, নারায়নখোলা বেড় শিমুলগাছ প্রাঙ্গণ, বানেশ্বর্দী, টালকি, চন্দ্রকোনা, রিহিলা, কেজাইকাটা, ডেউয়াতলা, হনুমানের চর,। নালিতাবাড়ী উপজেলার বালুঘাটা, রাজনগর, কুশলনগর, খলচান্দা, সমশ্চুড়া, গারোকোনা, তন্তর, নয়াবিল, চাটকিয়া। ঝিনাইগাতী উপজেলার তিনআনী বাজার, ঘাগড়া, বনগাঁও, ধানশাইল, গান্ধীগাঁও, তিনানি, মালিজিকান্দা, হাতিবান্দা, তেতুলতলা। শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়ারচর, শিমুলচূড়া, ভেলুয়া, কাকিলাকুড়া, ভায়াডাঙ্গা, কর্ণঝোড়া ও রানীশিমুল গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় জমজমাট বৈশাখী মেলা। এসব মেলায় কোথাও কোথাও কেবল কেনাকাটার পসরা বসলেও অনেক স্থানে চলে ঘোড় দৌড়, লাঠি খেলা, কুস্তিসহ দেশীয় নানা খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। তবে ইদানিং মেলায় আধূনিকতার ছোয়ায় চলে র্যাফেল ড্র ও আধূনিক নাচ-গানের আসরও বসে। এছাড়া কোথাও কোথাও আবার রাতে বসে বাউল গানের আসর ।বৈশাখী মেলা উপলক্ষে অনুষ্ঠিত উল্লিখিত বিভিন্ন ধরনের খেলার খেলোয়াড় এবং বাউল গানের দলের শিল্পীরাও প্রস্তুতি থাকে মেলার দিন প্রতিযোগিতা ও গানের আসরে অংশ নেওয়ার জন্য। অনেক খেলোয়াড় ও গানের শিল্পীদের টাকা দিয়ে আগাম বায়না করে রাখে বলে জানালেন বেশ কয়েকটি মেলা কমিটির সদস্য।এদিকে আসন্ন বাংলা নববর্ষকে সুষ্ঠু, উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে বরণ করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা অনুসারে জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে এক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসময় জেলা পরিষদ প্রশাসক এ.বি.এম. মামুনুর রশীদ পলাশ, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মিজ্ আরিফা সিদ্দিকা পুলিশ সুপার এর প্রতিনিধি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজ্ নাসরিন আক্তার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ শাকিল আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।