শেরপুর     শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
 ‍SherpurTimes24

প্লাস্টিকের দাপটে বিলুপ্তির পথে নিকলীর মৃৎশিল্প, কারিগরদের মানবেতর জীবন

দশক তিনেক আগেও গ্রামীণ জনপদে মাটির তৈরি থালা-বাসন, কলস আর হাঁড়িপাতিলের জয়জয়কার ছিল। গৃহস্থালি থেকে শুরু করে উৎসব-পার্বণ—সবখানেই মাটির তৈরি জিনিসের বিকল্প ছিল না। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের সস্তা আর সহজলভ্যতার দাপটে দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার পালপাড়ার কারিগর ও পরিবারের সদস্যরা এখন নিদারুণ অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন এবং খুঁজছেন বিকল্প পেশা। গ্রামবাংলার প্রাচীন এই শিল্প এখন কেবল প্রদর্শনী আর শৌখিনতার বস্তুতে পরিণত হয়েছে।মৃৎশিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রী ওজনে হালকা, টেকসই এবং দাম কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ মাটির পাত্রের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এক সময় নদী বা খাল থেকে বিনামূল্যে মাটি সংগ্রহ করা যেত, এখন চড়া দামে মাটি কিনতে হয়। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পোড়ানোর জ্বালানি ও রঙের খরচ। আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন নকশার অভাবে মৃৎশিল্পীরা নতুন প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি নেই বললেই চলে।সরেজমিনে নিকলী উপজেলার মৃৎশিল্প এলাকা পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, শিল্পীরা মাটি দিয়ে পুতুল, ফুলের টব, হাঁড়িপাতিলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের গ্রামে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। পুরোনো টিনের ঘর, ভেতরটা দিনের বেলাতেও অন্ধকার। প্রতিটি বাড়িতে ছোট ছোট চাকা চালিয়ে মাটি কাটছেন অনেকে।জানা গেছে, নিকলী উপজেলার পালপাড়ায় এই শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় ৩০টি পরিবার রয়েছে। কিন্তু মাটির অভাব, প্রয়োজনীয় পুঁজি ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে এই মৃৎশিল্প। আগে বৈশাখ এলে খেলনাসহ মাটির জিনিসপত্র তৈরির ধুম পড়ত পালপাড়ায়। বিভিন্ন উৎসবে তখন একজন মৃৎশিল্পীর আয় ছিল ৫০-৬০ হাজার টাকা। তবে এখন উৎসব কিংবা পূজা-পার্বণে আয় হচ্ছে মাত্র ৮-১০ হাজার টাকা, যাতে খরচের টাকাই উঠছে না।প্রবীণ মৃৎশিল্পী জোসনা রানী পাল (৯০) জানান, এই পল্লীতে কোনো একসময় ৩০০ পরিবার এই কাজের সাথে যুক্ত ছিল। সময়ের পরিক্রমায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন। তিনি বলেন, “অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন এখনকার কারিগররা।”কারিগররা জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর পণ্যে নতুনত্ব আনা হয়েছে। হাতি, ঘোড়া, গরু, হরিণ, বাঘ, হাঁস, মুরগি ও বাহারি সব মাটির ফলের নকশা করা হচ্ছে। কোনো রাসায়নিক ছাড়াই প্রাকৃতিক উপায়ে গাছের কষ দিয়ে এসব পণ্য রং করা হয়। তারা এসব পণ্য ভৈরব, কিশোরগঞ্জ, হোসেনপুর, কটিয়াদী ও বাজিতপুর উপজেলার বিভিন্ন মেলায় নিয়ে বিক্রি করেন।মৃৎশিল্পী গোপন চন্দ্র দাস বলেন, “সংসার চালানোই এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাটি, বালি, খড় সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে।”আরেক শিল্পী জীবন পাল বলেন, “আগে যেখানে ১০টি পণ্য বিক্রি হতো, এখন হয় মাত্র দুইটি। সরকার যদি আমাদের চাকা ঘোরানোর মোটর বা মাটি ছানার মেশিন দিয়ে সহায়তা করত, তবে এই আদি পেশায় টিকে থাকা সহজ হতো।”মৃৎশিল্পী রণজিত পাল ও সরস্বতী রানী জানান, হাড়ভাঙা খাটুনি আর কব্জির ব্যথা সহ্য করে বাপ-দাদার এই পেশা ধরে রাখলেও লাভের মুখ দেখছেন না তারা। তাদের সন্তানরাও এই কষ্টের কাজ করতে চায় না। রতন পাল বলেন, “পৈতৃক এই পেশা ছেড়ে দেওয়াও সম্ভব নয়, আবার এটা আঁকড়ে ধরে টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, “নিকলীর ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২ জন মৃৎশিল্পীকে ৬ লাখ টাকা ঋণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সকল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”মৃৎশিল্প কেবল একটি পেশা নয়, এটি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ। সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপই পারে এই শিল্পকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে।

প্লাস্টিকের দাপটে বিলুপ্তির পথে নিকলীর মৃৎশিল্প, কারিগরদের মানবেতর জীবন