শেরপুর     মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
 ‍SherpurTimes24

শেরপুরে আট দশক ধরে চলছে কালো পাথর দিয়ে সাপে কাটার চিকিৎসা


প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

শেরপুরে আট দশক ধরে চলছে কালো পাথর দিয়ে সাপে কাটার চিকিৎসা
ছবি : প্রতিনিধি

প্রাচীন যুগ থেকে সাপে কাটা রোগীকে সারিয়ে তুলতে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করার গল্প শোনা যায়। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত যে পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়, তা হলো কবিরাজ বা ওঝার মাধ্যমে ওঝাগিরি করা। তবে ইনডিজিনাস নলেজ (কোনো জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিকশিত ও সংরক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা বা দর্শন) ব্যবহার করে অনেক অঞ্চলে ‘সফল’ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ এখনও চলমান রয়েছে। যেমন  শেরপুরে রয়েছে সাপে কাটার চিকিৎসায় ‘পাথর রহস্য’, যা প্রায় আট দশক ধরে চলছে।

পাথর দিয়ে বিষক্রিয়া নিষ্ক্রিয় করতে পারার যে দাবি নিয়ে এ প্রথার যাত্রা, তার শুরুটা ছিল দেশভাগের আগে। ১৯৪৬ সালে খ্রিষ্টান ধর্মীয় ব্রতধারী এক নারীর মাধ্যমে এ চিকিৎসা পদ্ধতির যাত্রা শুরু। উল্লেখ্য যে, ব্রতধারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক কাজে নিয়োজিত থাকেন। সিস্টার ইম্মানুয়েল নামে ওই নারী শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় গড়ে তোলেন ‘আওয়ার লেডি অব লর্ডস ডিসপেনসারি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

দাতব্য চিকিৎসালয়টির অবস্থান ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা সীমান্তবর্তী পাহাড়ি বারোমারী এলাকায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসায় একটি বিশেষ কালো পাথর ব্যবহারের দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে, এই পাথর দিয়ে সাপে কাটা রোগীর শরীরের বিষ শুষে নেওয়া হয়।

ডিসপেনসারির ইনচার্জ সিস্টার বাপ্তিস্তা রেমা জানান, পাথরটি কোথা থেকে আনা হয়েছে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য তাদের কাছে নেই। ধারণা করা হয়, বেলজিয়াম বা ফ্রান্স থেকে এই বিশেষ পাথরটি আনা হয়েছিল। একটি পাথরকে বিশেষ কৌশলে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সম্প্রতি সাপে কাটা অবস্থায় এখানে চিকিৎসা নেন রফিকুল ইসলাম নামে এক রোগী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার পায়ে সাপে কামড় দিছিল। পাথর দেওয়ার কিছুক্ষণ পর দেখি ব্যথা, শরীর খারাপ একটু একটু করে কমে গেছে। পরে আমি আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাই। এখন আমি একদম সুস্থ আছি।’

আরেক রোগীর স্বজন মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে সাপে কামড় দেয়। আমরা খুব ভয় পাইছিলাম। পরে খোঁজখবর নিয়ে এখানে আনার পর চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সে ভালো হইছে। মূলত আমার ছেলেকে একটা পাথর লাগায় রাখছিল, কিছুক্ষণ পর সেই পাথরটা নিজে নিজেই পড়ে যায় আর আমার ছেলে সুস্থ হয়ে যায়।’


দাতব্য চিকিৎসালয়টির কর্তৃপক্ষ জানায়, সাপে কাটা রোগীর ক্ষতস্থানে বিশেষ কালো রঙের পাথরটি রাখা হলে তা শরীরে বিষ থাকা অবস্থায় ক্ষতস্থানে আটকে থাকে। বিষ শোষিত হয়ে গেলে নিজে থেকেই পড়ে যায়। আগে বিনামূল্যে সেবা দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, এভাবে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ পদ্ধতিতে এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গত কয়েক বছরে শত শত রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। গত সাত বছরে এ পদ্ধতিতে ১ হাজার ৮৫ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এইটা অনেক বছর ধরেই চলতাছে।  কেউ বলে পাথরে ভালো হয়, আবার কেউ বলে এইটা ঠিক না।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, সাধারণ সাপে কামড় দিলে এখানে আনলে মানুষ ভালোও হয়। কিন্তু বিষাক্ত সাপ হলে আবার অবস্থা একেক রকম থাকে, সবাই একভাবে সেরে উঠে না। তাই এইটা নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।’

স্থানীয় বাসিন্দা খালেদা আক্তার বলেন, ‘এটা অনেক পুরান একটা বিশ্বাস। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ আবার বলে হাসপাতালে নেওয়া ভালো। কিন্তু অনেক বছর ধরেই মানুষ এখানে আইসা-যাইতাছে।’

এ বিষয়ে শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ শাহীন বলেন, ‘এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। সাপে কাটলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করাই একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা। যদি তা না করা হয়, তাহলে রোগীর বড় ধরনের জীবনঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’

আপনার মতামত লিখুন

 ‍SherpurTimes24

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬


শেরপুরে আট দশক ধরে চলছে কালো পাথর দিয়ে সাপে কাটার চিকিৎসা

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬

featured Image

প্রাচীন যুগ থেকে সাপে কাটা রোগীকে সারিয়ে তুলতে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করার গল্প শোনা যায়। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত যে পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়, তা হলো কবিরাজ বা ওঝার মাধ্যমে ওঝাগিরি করা। তবে ইনডিজিনাস নলেজ (কোনো জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিকশিত ও সংরক্ষিত জ্ঞান, দক্ষতা বা দর্শন) ব্যবহার করে অনেক অঞ্চলে ‘সফল’ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ এখনও চলমান রয়েছে। যেমন  শেরপুরে রয়েছে সাপে কাটার চিকিৎসায় ‘পাথর রহস্য’, যা প্রায় আট দশক ধরে চলছে।

পাথর দিয়ে বিষক্রিয়া নিষ্ক্রিয় করতে পারার যে দাবি নিয়ে এ প্রথার যাত্রা, তার শুরুটা ছিল দেশভাগের আগে। ১৯৪৬ সালে খ্রিষ্টান ধর্মীয় ব্রতধারী এক নারীর মাধ্যমে এ চিকিৎসা পদ্ধতির যাত্রা শুরু। উল্লেখ্য যে, ব্রতধারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক কাজে নিয়োজিত থাকেন। সিস্টার ইম্মানুয়েল নামে ওই নারী শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় গড়ে তোলেন ‘আওয়ার লেডি অব লর্ডস ডিসপেনসারি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

দাতব্য চিকিৎসালয়টির অবস্থান ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা সীমান্তবর্তী পাহাড়ি বারোমারী এলাকায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে সাপে কাটা রোগীদের চিকিৎসায় একটি বিশেষ কালো পাথর ব্যবহারের দাবি করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে, এই পাথর দিয়ে সাপে কাটা রোগীর শরীরের বিষ শুষে নেওয়া হয়।

ডিসপেনসারির ইনচার্জ সিস্টার বাপ্তিস্তা রেমা জানান, পাথরটি কোথা থেকে আনা হয়েছে এ বিষয়ে সঠিক তথ্য তাদের কাছে নেই। ধারণা করা হয়, বেলজিয়াম বা ফ্রান্স থেকে এই বিশেষ পাথরটি আনা হয়েছিল। একটি পাথরকে বিশেষ কৌশলে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সম্প্রতি সাপে কাটা অবস্থায় এখানে চিকিৎসা নেন রফিকুল ইসলাম নামে এক রোগী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার পায়ে সাপে কামড় দিছিল। পাথর দেওয়ার কিছুক্ষণ পর দেখি ব্যথা, শরীর খারাপ একটু একটু করে কমে গেছে। পরে আমি আস্তে আস্তে ভালো হয়ে যাই। এখন আমি একদম সুস্থ আছি।’

আরেক রোগীর স্বজন মর্জিনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে সাপে কামড় দেয়। আমরা খুব ভয় পাইছিলাম। পরে খোঁজখবর নিয়ে এখানে আনার পর চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সে ভালো হইছে। মূলত আমার ছেলেকে একটা পাথর লাগায় রাখছিল, কিছুক্ষণ পর সেই পাথরটা নিজে নিজেই পড়ে যায় আর আমার ছেলে সুস্থ হয়ে যায়।’


দাতব্য চিকিৎসালয়টির কর্তৃপক্ষ জানায়, সাপে কাটা রোগীর ক্ষতস্থানে বিশেষ কালো রঙের পাথরটি রাখা হলে তা শরীরে বিষ থাকা অবস্থায় ক্ষতস্থানে আটকে থাকে। বিষ শোষিত হয়ে গেলে নিজে থেকেই পড়ে যায়। আগে বিনামূল্যে সেবা দেওয়া হলেও বর্তমানে প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, এভাবে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ পদ্ধতিতে এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গত কয়েক বছরে শত শত রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। গত সাত বছরে এ পদ্ধতিতে ১ হাজার ৮৫ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এইটা অনেক বছর ধরেই চলতাছে।  কেউ বলে পাথরে ভালো হয়, আবার কেউ বলে এইটা ঠিক না।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, সাধারণ সাপে কামড় দিলে এখানে আনলে মানুষ ভালোও হয়। কিন্তু বিষাক্ত সাপ হলে আবার অবস্থা একেক রকম থাকে, সবাই একভাবে সেরে উঠে না। তাই এইটা নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।’

স্থানীয় বাসিন্দা খালেদা আক্তার বলেন, ‘এটা অনেক পুরান একটা বিশ্বাস। কেউ বিশ্বাস করে, কেউ আবার বলে হাসপাতালে নেওয়া ভালো। কিন্তু অনেক বছর ধরেই মানুষ এখানে আইসা-যাইতাছে।’

এ বিষয়ে শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ শাহীন বলেন, ‘এ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। সাপে কাটলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করাই একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা। যদি তা না করা হয়, তাহলে রোগীর বড় ধরনের জীবনঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’


 ‍SherpurTimes24


কপিরাইট © ২০২৬ ‍SherpurTimes24 । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত