জামালপুর শহর ও এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক কলেজ ছাত্রী, দুই গৃহবধূ, এক কিশোরী ও এক ব্যবসায়ী। এর মধ্যে বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবরে গোটা জেলাজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
গত ২৩ আগস্ট জামালপুর শহরের শেখের ভিটা রেলক্রসিং এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে ইশরাত জাহান (৩০) নামের এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিন ফ্ল্যাটের ভেতরে আটকে থাকা তাঁর দুই অবুঝ শিশুসন্তান জানালা দিয়ে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি চেয়ে কান্নাকাটি করলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে শিশুদের উদ্ধার করেন এবং একটি কক্ষ থেকে ইশরাতের লাশ দেখতে পান। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই নিহতের স্বামীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই চার দিন পর ২৭ আগস্ট মাদারগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া পূর্বপাড়া এলাকায় নিজের দোকান থেকে সামিউল ইসলাম ওরফে ফকির আলী (৪৫) নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই দোকানেই রাতযাপন করতেন। সারাদিন দোকান বন্ধ থাকায় সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাঁর নিথর দেহ দেখতে পান।
পরদিন ২৮ আগস্ট সকালে একই উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নে একটি কৃষিজমির পাশের সেচপাম্পের ঘর থেকে রূপসী আক্তার (১৬) নামের এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আগের রাত থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। একই দিন রাতে জামালপুর শহরের দক্ষিণ কাচারীপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান রিমার (২৫) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে তিনি চরম মানসিক চাপে ভুগছিলেন। তবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা নিশ্চিত হতে জোর তদন্ত চলছে। সর্বশেষ ২৯ আগস্ট নান্দিনা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসা থেকে শারমিন আক্তার (২৬) নামের আরেক গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এক সপ্তাহে পাঁচটি লাশ উদ্ধারের মধ্যে চারটি ঘটনাই নারী ও কিশোরী কেন্দ্রিক। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে শহরের আবাসিক এলাকার ভাড়া বাসায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নগর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শহরের বকুলতলা এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, অল্প কয়েক দিনের মধ্যে এতগুলো লাশ উদ্ধারের ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নারী ও তরুণীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো সমাজকে বেশি নাড়া দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত রহস্য দ্রুত উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
দক্ষিণ কাচারীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হকের মতে, একের পর এক লাশ উদ্ধারের খবরে মানুষের মধ্যে নানা গুঞ্জন ও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। মানুষের আতঙ্ক কাটাতে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রশাসনের নিয়মিত তথ্য দেওয়া উচিত।
সচেতন নাগরিক জাহাঙ্গীর সেলিম মনে করেন, শহরের আবাসিক এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।
এসব সার্বিক বিষয়ে জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াহিয়া আল মামুন জানান, প্রতিটি ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে বিশেষজ্ঞদের মতামতসহ আদালতে তথ্য উপস্থাপন করে থাকে। এর বাইরে সামাজিক অবক্ষয় রোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় বিট পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। জুমার নামাজের সময় বিভিন্ন মসজিদে জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, হত্যা ও আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুল হক বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে মাদকাসক্তি ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার কাজ চলমান রয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে মানসিক অবসাদ থেকে দূরে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের মানসিক সমস্যায় স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়। তবে বর্তমানে যেভাবে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, তাতে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সচেতনতা আরও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সামাজিকভাবেও সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং পারিবারিকভাবে সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে পুরো জামালপুরবাসী এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
জামালপুর শহর ও এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন এক কলেজ ছাত্রী, দুই গৃহবধূ, এক কিশোরী ও এক ব্যবসায়ী। এর মধ্যে বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবরে গোটা জেলাজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
গত ২৩ আগস্ট জামালপুর শহরের শেখের ভিটা রেলক্রসিং এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে ইশরাত জাহান (৩০) নামের এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিন ফ্ল্যাটের ভেতরে আটকে থাকা তাঁর দুই অবুঝ শিশুসন্তান জানালা দিয়ে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি চেয়ে কান্নাকাটি করলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে শিশুদের উদ্ধার করেন এবং একটি কক্ষ থেকে ইশরাতের লাশ দেখতে পান। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই নিহতের স্বামীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই চার দিন পর ২৭ আগস্ট মাদারগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালিয়া পূর্বপাড়া এলাকায় নিজের দোকান থেকে সামিউল ইসলাম ওরফে ফকির আলী (৪৫) নামের এক ভাঙারি ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই দোকানেই রাতযাপন করতেন। সারাদিন দোকান বন্ধ থাকায় সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তাঁর নিথর দেহ দেখতে পান।
পরদিন ২৮ আগস্ট সকালে একই উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নে একটি কৃষিজমির পাশের সেচপাম্পের ঘর থেকে রূপসী আক্তার (১৬) নামের এক কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আগের রাত থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। একই দিন রাতে জামালপুর শহরের দক্ষিণ কাচারীপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান রিমার (২৫) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক টানাপোড়েনের কারণে তিনি চরম মানসিক চাপে ভুগছিলেন। তবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা নিশ্চিত হতে জোর তদন্ত চলছে। সর্বশেষ ২৯ আগস্ট নান্দিনা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি ভাড়া বাসা থেকে শারমিন আক্তার (২৬) নামের আরেক গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
এক সপ্তাহে পাঁচটি লাশ উদ্ধারের মধ্যে চারটি ঘটনাই নারী ও কিশোরী কেন্দ্রিক। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে শহরের আবাসিক এলাকার ভাড়া বাসায়। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নগর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শহরের বকুলতলা এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, অল্প কয়েক দিনের মধ্যে এতগুলো লাশ উদ্ধারের ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে নারী ও তরুণীদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো সমাজকে বেশি নাড়া দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত রহস্য দ্রুত উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
দক্ষিণ কাচারীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হকের মতে, একের পর এক লাশ উদ্ধারের খবরে মানুষের মধ্যে নানা গুঞ্জন ও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। মানুষের আতঙ্ক কাটাতে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রশাসনের নিয়মিত তথ্য দেওয়া উচিত।
সচেতন নাগরিক জাহাঙ্গীর সেলিম মনে করেন, শহরের আবাসিক এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।
এসব সার্বিক বিষয়ে জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইয়াহিয়া আল মামুন জানান, প্রতিটি ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে বিশেষজ্ঞদের মতামতসহ আদালতে তথ্য উপস্থাপন করে থাকে। এর বাইরে সামাজিক অবক্ষয় রোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় বিট পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। জুমার নামাজের সময় বিভিন্ন মসজিদে জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, হত্যা ও আত্মহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আজিজুল হক বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে মাদকাসক্তি ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার কাজ চলমান রয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে মানসিক অবসাদ থেকে দূরে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের মানসিক সমস্যায় স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়। তবে বর্তমানে যেভাবে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, তাতে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সচেতনতা আরও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সামাজিকভাবেও সবাইকে সচেতন হতে হবে। প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং পারিবারিকভাবে সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে পুরো জামালপুরবাসী এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন