ঝগড়া থেকে ঝগড়ারচর: "যে ঝগড়া জন্ম দিয়েছিল একটি জনপদের নাম"
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ঝগড়ারচর। নামটি শুনলেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, একটি জনপদের নাম কেন "ঝগড়ারচর"? নামের পেছনে কী কোনো সংঘাতের ইতিহাস লুকিয়ে আছে? সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ঝগড়ারচর বাজার নিয়ে আলোচনা এবং স্পিকারের রসিক মন্তব্যের পর আবারও আলোচনায় এসেছে এই ঐতিহ্যবাহী বাজার ও এর নামকরণের ইতিহাস।শ্রীবরদী উপজেলার ভেলুয়া ইউনিয়নের বারারচর মৌজায় অবস্থিত ঝগড়ারচর বাজার শুধু একটি স্থানীয় হাট নয়, এটি শেরপুর ও জামালপুর অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এই বাজার। শেরপুর, জামালপুর, বকশীগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ এমনকি কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর এলাকার মানুষও বিভিন্ন প্রয়োজনে এখানে আসেন।বর্তমান ঝগড়ারচর বাজারের ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যায় ভিন্ন এক নাম। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় এর নাম ছিল "গোবিন্দগঞ্জ বাজার"। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাজার স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে বাউশমারী-কড়ইতলা এলাকার মানুষ এবং বর্তমান স্থানের বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিন মতবিরোধ ও বাকবিতণ্ডা চলতে থাকে। সেই বিরোধ বা "ঝগড়া" থেকেই ধীরে ধীরে এলাকার পরিচিতি হয়ে ওঠে "ঝগড়ারচর"।সময় গড়িয়েছে, বদলেছে জনপদের চেহারা। কিন্তু নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই ইতিহাস আজও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। একসময়কার গোবিন্দগঞ্জ নামটি হারিয়ে গেলেও ঝগড়ারচর নামটি স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে মানুষের মনে ও মানচিত্রে।নামের সঙ্গে "ঝগড়া" শব্দটি জড়িয়ে থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়দের মতে, ঝগড়ারচর একটি শান্তিপূর্ণ, ব্যবসাবান্ধব ও সম্প্রীতির জনপদ। কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে এটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।বিশেষ করে ঝগড়ারচরের মিষ্টি বরই, মহিষের টক দই এবং শীতকালীন ঐতিহ্যবাহী গাবা বা পিঠালি তরকারি এলাকার পরিচিতিকে ছড়িয়ে দিয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব স্থানীয় পণ্য আজও ঝগড়ারচরের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অংশ।সম্প্রতি জাতীয় সংসদে শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বাজারটিতে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি জানান। তিনি বাজারটির জনসমাগম, বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেন। পরে স্পিকারের একটি রসিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।সংসদের সেই আলোচনা যেন নতুন করে আলো ফেলেছে ঝগড়ারচরের ইতিহাসের ওপর। অনেকেই জানতে শুরু করেছেন, কীভাবে একটি ঝগড়া থেকে জন্ম নিয়েছিল একটি জনপদের নাম, আর সেই নামই আজ হয়ে উঠেছে একটি অঞ্চলের পরিচয়ের প্রতীক।ইতিহাস, ঐতিহ্য, বাণিজ্য ও জনজীবনের মেলবন্ধনে ঝগড়ারচর আজ শুধু একটি বাজার নয়, বরং শেরপুর অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বাজারটির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে, যাতে এই ঐতিহ্যবাহী জনপদ আগামী দিনেও তার স্বকীয়তা ধরে রাখতে পারে।