মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ : ধ্বংসস্তূপে মানবতার আর্তনাদ
২০২৬ সালের এপ্রিল—মানবসভ্যতার ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে এ সময়কাল। মধ্যপ্রাচ্য আজ পরিণত হয়েছে এক বিস্তীর্ণ ধ্বংসভূমিতে, যেখানে প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে মৃত্যু, বেদনা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল—এই তিন শক্তির সরাসরি ও পরোক্ষ সংঘর্ষে গোটা অঞ্চল আজ অস্থিতিশীলতার গভীর খাদে নিমজ্জিত।মাত্র ৪০ দিনের এই যুদ্ধে ইরানের ওপর নেমে এসেছে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ। প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে—যার মধ্যে অধিকাংশই মানুষের বসতভিটা। আবাসিক বাড়ি, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সামরিক স্থাপনা—কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের ভয়াবহ আঘাত থেকে। স্বাস্থ্য খাতেও আঘাত এসেছে নির্মমভাবে—শত শত হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হওয়ায় একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা একটি দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘ মেয়াদে বিপর্যস্ত করার জন্য যথেষ্ট। শিল্পকারখানা, বাণিজ্যকেন্দ্র এবং অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া হবে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল। এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন তিন হাজারেরও বেশি মানুষ—যাদের মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি। কিন্তু সংখ্যার এই হিসাব প্রকৃত যন্ত্রণার মাত্রা প্রকাশ করতে পারে না। প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে, একটি সমাজকে শোকের ভারে নত করেছে।সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো বাস্তুচ্যুতি। প্রায় ৫০ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন। লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত এই মানবস্রোত আজ আশ্রয় নিয়েছেন অস্থায়ী শিবিরেÑযেখানে নেই পর্যাপ্ত খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা কিংবা নিরাপত্তা। তাঁবুর নিচে কাটছে তাদের অনিশ্চিত জীবন, প্রতিদিনই নতুন করে বাঁচার লড়াই।যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের প্রতিযোগিতা। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও উৎক্ষেপণ ঘাঁটিগুলোয় আঘাত হানা হয়েছে, অন্যদিকে ইরানি পাল্টা হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যাপকহারে। ড্রোন ও মিসাইলের এই আধুনিক যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে—বর্তমান সংঘাতে কোনো নিরাপদ অঞ্চল নেই। সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি বেসামরিক এলাকাও হয়ে উঠেছে সহজ টার্গেট।যুদ্ধবিরতি : স্বস্তির নাকি বিরতির মুহূর্ত১০ এপ্রিল ২০২৬-এ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে এই বিরতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। পাকিস্তান বিবদমান দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে । অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এমন যুদ্ধবিরতি অনেক সময়ই শুধু নতুন সংঘর্ষের প্রস্তুতির সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। এই যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এর ঢেউ আঘাত হেনেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় এক কোটি প্রবাসীর চাকরি আজ অনিশ্চয়তার মুখে। তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও পণ্যের দামে।মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ, মাটিতে ধ্বংসের চিহ্ন আর মানুষের চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। তিলে তিলে গড়ে ওঠা নগর, সুরম্য প্রাসাদ, সমৃদ্ধ জনপদ—সবকিছু যেন মুহূর্তেই মিশে গেছে ধুলায়। প্রশ্ন রয়ে যায়—এই অঞ্চল কি আবার আগের রূপে ফিরে আসতে পারবে? কত বছর লাগবে পুনর্গঠনে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মানবতা কি এই ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে?যুদ্ধ কখনো শুধু ভূখণ্ড দখলের লড়াই নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, সভ্যতা এবং ভবিষ্যতের ওপর এক নির্মম আঘাত। তাই এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে শান্তি—একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক শান্তি, যা মানবতার অস্তিত্বকে রক্ষা করতে পারে।সংঘাতের নতুন অধ্যায়ের পূর্বাভাসস্বল্পসময়ের জন্য যুদ্ধবিরতির নীরবতা নেমে এলেও মধ্যপ্রাচ্য আজও যেন আগ্নেয়গিরির মতো অস্থিরÑযেকোনো মুহূর্তে যার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল—এই ত্রিমুখী উত্তেজনা সাময়িকভাবে স্তিমিত হলেও বাস্তবে সংঘাতের আগুন নিভে যায়নি; বরং ভেতরে ভেতরে আরো দাউ দাউ করে জ্বলছে।সাম্প্রতিক আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনার দিকে ধাবিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি—ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে এবং একটি কঠোর আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে হবে। কিন্তু ইরান এই দাবিকে তার সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তাদের অবস্থান স্পষ্ট—শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় তারা নিজেদের সক্ষমতা ত্যাগ করবে না। ফলে আলোচনার টেবিল এখন কার্যত অচল।ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তিনি প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সুবিধাজনক সময়ে ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হতে পারে—এমনকি অতীতে তিনি ইরানের হাজার বছরের সভ্যতাকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার’ কথাও উল্লেখ করেছিলেন। এ ধরনের বক্তব্য শুধু সামরিক হুমকি নয়; এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল, যা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।অন্যদিকে, ইরানও সমানভাবে কঠোর বার্তা দিয়েছে—তাদের ‘হাত ট্রিগারে’, অর্থাৎ তারা যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত। বর্তমান উত্তেজনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নৌ-অবরোধ আরোপের সম্ভাবনার কথা বলছে, যা কার্যত ইরানের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের শামিল। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে—হরমুজ কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। এ অবস্থান থেকে বোঝা যায়, এই প্রণালি ঘিরে সামান্য সংঘর্ষও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ তার শাসনামলে বারবার ইসরাইলবিরোধী কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ইসরাইল ঝরাপাতা। পৃথিবীতে ইসরাইল নামক কোনো দেশ থাকবে না। এসব বক্তব্য হতে পারে সামরিক সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ অথবা আদর্শিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত—যার লক্ষ্য ছিল অভ্যন্তরীণ জনমতকে সংহত করা এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিপক্ষকে বার্তা দেওয়া। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন বক্তব্য সবসময় সরাসরি সামরিক সক্ষমতার প্রতিফলন নয়। অনেক সময় এটি ‘deterrence rhetoric’—অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে ভয় দেখিয়ে সংঘাত এড়ানোর কৌশল।ইরান দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আসছে—বিশেষত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীর মাধ্যমে। অন্যদিকে ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সামরিকভাবে উন্নত রাষ্ট্র, যার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং পরোক্ষভাবে পারমাণবিক সক্ষমতার কথাও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত। এই প্রেক্ষাপটে ‘একটি দেশ ধ্বংস হলে অপরটিও ধ্বংস হবে’—এ ধারণাটি মূলত ‘পারস্পরিক ধ্বংসের নিশ্চয়তা’-এর মতো একটি তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। বিষয়টি সরল গাণিতিক সমীকরণের মতো নয়—বরং এটি এক জটিল শক্তির খেলা, যেখানে বক্তব্য, সক্ষমতা, কৌশল এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি একে অন্যের সঙ্গে জড়িত। তবে বাস্তবে এটি বহুস্তরীয় কৌশল, জোট রাজনীতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক যুদ্ধে কোনো সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এখানে যুক্ত হয়—আন্তর্জাতিক জোট ও মিত্রশক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, সাইবার যুদ্ধ, গোয়েন্দা তৎপরতা ও আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাত ।অর্থাৎ, ইরান ধ্বংস হলে ইসরাইলও ধ্বংস হয়ে যাবে—এটি একটি সম্ভাব্য ভয়াবহ দৃশ্যপট হলেও তা অবশ্যম্ভাবী বা সরলভাবে নির্ধারিত নয়। এ ধরনের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বা উদ্দেশ্য সাধারণত তিনটি হতে পারে—মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ থেকে নিরুৎসাহিত করা, নিজ দেশের জনগণ ও মিত্রদের কাছে শক্ত অবস্থান প্রদর্শন এবং প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা গোপন রেখে অনিশ্চয়তা তৈরি করা।লেবানন ফ্রন্ট : বিস্তৃত সংঘাতের ইঙ্গিতইসরাইল-লেবানন ফ্রন্টে ১০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি চলছে । বিরতি শেষে যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে ওঠার সমূহ আশঙ্কা বিদ্যমান । লেবানন সীমান্তে ইসরাইলের সামরিক অভিযান এটি ইঙ্গিত দেয় যে যুদ্ধ শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ধীরে ধীরে আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে। লেবাননের ভূখণ্ডে সংঘর্ষের বিস্তার মানে, বিভিন্ন মিত্রগোষ্ঠী ও অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির সম্পৃক্ততা, যা যুদ্ধকে আরো জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।বর্তমান বাস্তবতায় কয়েকটি বিষয় সংঘাতকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে—কূটনৈতিক ব্যর্থতা : আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেলে সামরিক বিকল্পই সামনে আসে; পারমাণবিক ইস্যু : এটি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন; অর্থনৈতিক স্বার্থ : তেল ও জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়; আঞ্চলিক জোট রাজনীতি : এক দেশের সংঘাত দ্রুত বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।আজ মধ্যপ্রাচ্যে আপাত শান্তি বিরাজ করলেও সেটি এক ধরনের ঝড়ের পূর্বাভাসমাত্র। যুদ্ধবিরতির এই ক্ষণস্থায়ী বিরতি যেন শুধু নতুন সংঘর্ষের প্রস্তুতির সময় দিচ্ছে উভয় পক্ষকে। যেকোনো মুহূর্তে আবার বেজে উঠতে পারে যুদ্ধের দামামা, শুরু হতে পারে আগুনের নতুন খেলা—যার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকবে না শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে, বরং ছড়িয়ে পড়বে সমগ্র বিশ্বব্যবস্থায়। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, সংযম এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা। কারণ আরেকটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ মানেই হবে—আরো ধ্বংস, আরো মৃত্যু এবং মানবতার জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়।মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে শুধু ‘কে জিতল, কে হারল’ এই সরল সমীকরণে বিচার করা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। আমেরিকা, ইসরাইল, ইরান ও লেবানন ফ্রন্ট—প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা চালালেও এই যুদ্ধের প্রকৃত ফল ভিন্ন এক করুণ সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে : এখানে কোনো একক বিজয়ী নেই, বরং নিশ্চিত পরাজিত হচ্ছে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।যুদ্ধের প্রতিটি বিস্ফোরণ, প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র, প্রতিটি সামরিক অভিযানের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ভাঙা পরিবার, অনাথ শিশু, এবং স্বজনহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাস। যারা আজ ঘর হারাচ্ছে, তারা শুধু আশ্রয়হীনই হচ্ছে না—হারাচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের স্বপ্ন, তাদের নিরাপত্তাবোধ। একসময়ের সচ্ছল পরিবারগুলো মুহূর্তেই পরিণত হচ্ছে নিঃস্বতায় নিমজ্জিত মানবগোষ্ঠীতে। যুদ্ধ তাদের জীবনকে শুধু ধ্বংসই করছে না, বরং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও সামাজিক সংকটের বীজ বপন করছে।অন্যদিকে, এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও কিছু পক্ষ নীরবে লাভবান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন চুক্তিতে সমৃদ্ধ হচ্ছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের নামে কনস্ট্রাকশন কোম্পানিগুলো ভবিষ্যৎ মুনাফার হিসাব কষছে। অর্থাৎ, একদিকে যখন মানবতা রক্তাক্ত, অন্যদিকে তখন ব্যবসার চাকা আরো দ্রুত ঘুরছে—এ এক নির্মম বৈপরীত্য।এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ। শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক বিবৃতি দিয়ে এ সংকটের অবসান সম্ভব নয়। প্রভাবশালী দেশগুলোর উচিত সংকীর্ণ ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে একটি টেকসই, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রক্রিয়া গড়ে তোলা। অন্যথায় এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসবে এবং প্রতিবারই এর মূল্য দিতে হবে নিরীহ মানুষদের। অতএব, এখনই সময়—সংঘাত নয়, সমাধানের পথে হাঁটার। কারণ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য শান্তির কোনো বিকল্প নেই।লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তী সরকার