র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করা হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই। র্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় না করে নতুন সংস্থায় তা হস্তান্তর করা হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী সদস্যদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী সদস্যদের প্রস্তাব মতে আমরা নিয়েছি। তারা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। তার পরের দফায় যে সংশোধনী, এটা হচ্ছে ক্লারিক্যাল মিস্টেক—উপধারা দুইয়ের মধ্যে একটা ব্র্যাকেট বন্ধন। এটুকু।’
বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্টের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো পরামর্শ ছাড়াই এত দ্রুত বিলটি পাস করা যোগ্য—এটা তারা বলেছেন। আমাদের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ছিল, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল, প্রতিশ্রুতি ছিল বিলুপ্ত করা হবে। আমাদের নির্বাচন ইশতেহারে ছিল, সব পক্ষের দাবি ছিল র্যাব আমরা বিলুপ্ত করছি।’
তিনি বলেন, ‘এখন এই বিল যতই বিলম্বিত হবে, র্যাব কিন্তু অস্তিত্ব ঠিকই রয়ে যাবে, র্যাবই রয়ে যাবে। এখন বিরোধী দলীয় সদস্যরা কি তাই চান?’
বিল নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও পরামর্শ হয়নি—বিরোধীদের এমন বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনা-পরামর্শ প্রথম সেশন থেকে আমরা এর ওপর বক্তব্য রাখছি। দ্বিতীয় সেশন হয়েছে। তৃতীয় সেশনে আমরা এটা... ক্যাবিনেটে বিলটা যখন বিবেচনার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, তার আগের যে কর্মপদ্ধতি, সেই পদ্ধতি অনুসারে আমরা এটা ওয়েবসাইটে দিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সেটা দীর্ঘদিন ছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিলটা এখানে উত্থাপনের পরে আমরা চার-পাঁচ কার্যদিবসে সেটা আলোচনা করেছি। স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করেছি। বাইরের স্টেকহোল্ডারদের আমরা বিভিন্ন মতামত ওয়েবসাইটে পেয়েছি। সবগুলো কনসিডার করেছে। সুতরাং আলোচনা হয়েছে, পরামর্শ হয়েছে।’
র্যাব থেকে এসআরবিতে স্থানান্তরের সময় রেকর্ড কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে—বিরোধীদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি বিশিষ্ট আইনজীবী। রেকর্ড হস্তান্তরের বিষয়টা হচ্ছে একটা প্রসিডিউরাল ম্যাটার। এখানে এই বিষয়টা উত্থাপনের কোনো সুযোগই নাই। রেকর্ডটা বিধি অনুসারে রাখা।’
এসআরবির বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে ধারা ২৪-এর অভিযোগ প্রতিকার কমিটি যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ধারা ২৪ হচ্ছে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠন ইত্যাদি। ভেতরে তো আছে, ইউনিটের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি, বাইরের কোনো লোক দ্বারা উত্থাপিত অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনের জন্য এই কমিটি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা কোনো ক্রাইমের ক্ষেত্রে না। অভিযোগটা হচ্ছে, কোনো প্রাইভেট ইন্ডিভিজুয়াল এই এসআরবির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে অথবা এসআরবিরই কোনো সদস্য যদি অভ্যন্তরীণ, উইদইন ব্যাটালিয়ন কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, সেটা বিচারের কর্মপদ্ধতির জন্য একটা কমিটি গঠন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ডিপার্টমেন্টাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ, উইদইন ফোর্স। সে ডিসিপ্লিন ব্রেক করল, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে সেখানে হাইকোর্টের বিচারপতিকে করার কোনো সুযোগ নাই। আর হাইকোর্টের বিচারপতিকে যদি হেড করা হয়, তাহলে অ্যাডিশনাল আইজি প্রধান হিসেবে তার নিচে থাকতে হবে। এটা ডিপার্টমেন্টাল বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা আসলে যেটা মিন করতে চেয়েছেন, সেটা হচ্ছে কোনো ক্রাইমের ক্ষেত্রে যদি এই বাহিনীর সদস্যরা কোনো ক্রাইম করে থাকেন। এই অভিযোগ সেই অভিযোগ না। ইট ইজ আন্ডার সেকশন ২১।’
ধারা ২১-এর ব্যাখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিটের সদস্য কর্তৃক সংগঠিত শৃঙ্খলা লঙ্ঘন। ধারা ১৭-তে বর্ণিত শৃঙ্খলা ব্যতীত। যেটা ডিসিপ্লিনেরই অ্যাকশন, যেটা বলি আমরা সিভিল সার্ভিসে, যেটা বলা হয় সার্ভিস অ্যান্ড ডিসিপ্লিন রুলস অনুসারে যেটা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সেটার মতই।’
তিনি বলেন, ‘ধারা ১৭-তে উল্লেখ করা আছে কোন কোনগুলো ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন হবে। যেমন কর্তব্য পালনকালে মাতাল থাকলে, নেশাগ্রস্ত থাকলে, কারও ওপর বা কোনো কর্তব্যরত সদস্যকে আঘাত করলে, পেট্রোল ডিউটিতে না গেলে, ছুটি ছাড়া উপস্থিত থাকলে, অনুপস্থিত থাকলে, আইনসঙ্গত কোনো কাজ করতে অস্বীকার করলে ইত্যাদি।’
‘এইগুলো হচ্ছে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন বা ইন্ডিসিপ্লিন হওয়ার জন্য যে অ্যাকশনটা নেবে, সেটা এভাবে নির্ধারণ করা আছে—একদম সেকশন ওয়াইজ ১৮, ১৯, ২০, ২১। তবে বলছে, যদি কোনো সদস্য ক্রাইম করে থাকে, সেটা এখানে ২১ আছে—ধারা ১৭-তে বর্ণিত শৃঙ্খলা ব্যতীত ইউনিটের সদস্য কর্তৃক অন্য কোনো শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হইলে তাহার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। ক্লিয়ার।’
গ্রেপ্তারের পর আসামিকে কোথায় নেওয়া হবে—নোট অব ডিসেন্টে এমন প্রশ্নের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় যাবে। এটা তো বলাই আছ সিআরপিসি অনুসারে। এখানে প্রত্যেকটা ধারায় বলা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে এবং আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করিবেন এবং এতদসংক্রান্ত প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবেন।’
র্যাব বিলুপ্তির পর এসআরবি গঠন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই আইনটা যদি আমার বন্ধুরা বলে এটা রিপ্লেসমেন্ট অব র্যাবের রং—র্যাব আমরা বিলুপ্ত করেছি। আজকে আইন যদি পাস হয়, তারপরে আমরা একটা নতুন ব্যাটালিয়ন রেইজ করছি। সেই ব্যাটালিয়নের নাম হবে এসআরবি। র্যাবের সঙ্গে এটার কোনো সংস্পর্শ নাই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের নেত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ঠিকই বলেছেন যে তিনি বলেছেন র্যাব বিলুপ্ত করবেন। বিলুপ্ত করেছেন। আজকে আইন পাস করে দেন, র্যাব বিলুপ্ত।’
র্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ নতুন বাহিনীতে হস্তান্তর প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যদি আপনারা একটা কথা বলেছেন যে একই জিনিস আছে, সমস্ত সহায়-সম্পত্তি এই নতুন অর্গানাইজেশনের কাছে যাবে—মানে স্পিকার, এগুলোকে নিলাম দিয়ে দেবো? এত অস্ত্র-সস্ত্র, এত ইকুইপমেন্ট, এত ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট, এত সম্পদ—এগুলো কোথায় যাবে? কোথাও না কোথাও তো যাবে। রাষ্ট্রের সম্পদ।’
তিনি বলেন, ‘সেজন্য হস্তান্তর করতে হয়। আইদার এপিবিএনে যেত অথবা নতুন সংস্থাতে যাবে। তো নতুন সংস্থা যেন আমরা রেইজ করব, এখানে তো আবার প্রোকিউরমেন্ট করার দরকার নাই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমাদের রক্ষা করতে হবে।’
অর্থ অপচয় না করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রোকিউরমেন্ট এখানে অর্থমন্ত্রী সাহেব রয়েছেন। আবার যাতে আর্থিক কোনো ব্যবস্থা নিতে না হয়। অর্থ বরাদ্দ না হয়, অপচয় করবো না। আমরা এটাকে ব্যবহার করব। প্রয়োজনে এটাকে ইমপ্রুভ করবো।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যারা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রথম দুইজন রুহুল আমিন, জনাব রাশেদ—তাদের বক্তব্যে তেমন এখানে আইন বিষয়ে কিছু ছিল না। আমাদের জনাব বুলবুল তিনি একই কথাগুলো বলেছেন, যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন, সে তিনিই জমা দিয়েছেন। সেগুলোর জবাব আমি দিয়েছি।’
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটি বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্ত চেয়েছিলেন, কিন্তু কারও দাবি ছিল না আরেকটি সংস্থা করার। ঠিক। এটা তো সমাজের দাবি, সরকারের পরিচালনার স্বার্থে চাহিদা এবং যুগোপযোগী করার জন্য।’
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন ইউনিট গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে যত অপরাধ এখন হচ্ছে, কোনো না কোনোভাবে সেটার সঙ্গে সাইবার স্পেসের জড়িত থাকার একটা বিষয় রয়ে যাচ্ছে। সমস্ত অপরাধের মধ্যে সাইবার স্পেস ব্যবহার করার একটা প্রবণতা রয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা সাইবার স্পেসের এই অপরাধগুলো দমন করার জন্য কোনো কার্যকর আইন আনছি না।’
তিনি বলেন, ‘সেজন্য আমরা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় আছি। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মধ্যে আমরা একটা অ্যামেন্ডমেন্ট নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আর পুলিশ বাহিনীর অধীনে আরেকটা ইউনিট আমরা রেইজ করব। সেটার নাম হবে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট। সেটা তো সমাজের চাহিদা।’
র্যাব গঠনের আইনগত ভিত্তি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘র্যাব নামে এই সংস্থাটি ইউনিটটি ২০০৩ অথবা ২০০৪-এ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের একটা সেকশন ৬-এর আন্ডারে রেইজ করা হয়েছিল। সেই আইনটা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। একটা সেকশনের অধীনে একটা ইউনিট কাজ করছিল। অ্যাডহক ভিত্তিতে করছিল, দীর্ঘদিন কাজ করেছে। ডিফেক্ট বেরিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সেজন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থেকে আমরা সেটা বের করে নিয়ে এসে বিলুপ্ত করতে চাই। একই সঙ্গে এই আইনের পরে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনটা পাসের জন্য দিয়েছি।’
১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেই আইনটা ইংরেজিতে ছিল, কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল। সেই আইনটাও আমরা বঙ্গানুবাদ করে তাকে নতুন আইন হিসেবে নিয়ে আসছি এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্সটাকে আমরা রিপিল করে দিচ্ছি এবং রহিতকরণ ও হেফাজতকরণ সেকশনটা ওখানে আমরা রেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘এটা একই জিনিস রয়ে গেছে, শুধু আমরা মডার্নাইজ করেছি, বঙ্গানুবাদ করেছি। আর এখান থেকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সেকশনটা ডিলিট করে দিয়েছি। কারণ আজকে যদি আমরা র্যাপিড অ্যাকশন এখানে আইন পাস করি, এপিবিএনটা যদি আমরা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন না করি, তাহলে ওখানে র্যাবটা হয়ে যায়। সেজন্য এটা আমাদের জরুরি।’
এর আগে নোট অব ডিসেন্ট ও জনমত যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে বিরোধী সদস্যদের বক্তব্যের জবাব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অন্যান্য বিষয়গুলো নোট অব ডিসেন্টেরগুলো আমার মনে হয় আমি অ্যাড্রেস করেছি।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘মাননীয় বিরোধী নেতার বক্তব্যের জবাব দেই—র্যাব বিলুপ্ত চেয়েছিলেন, কিন্তু কারও দাবি ছিল না আরেকটি সংস্থা করার। ঠিক এটা তো সমাজের দাবি, সরকারের পরিচালনার স্বার্থে চাহিদা এবং যুগোপযোগী করার জন্য আমরা করছি।’

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করা হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, র্যাবের সঙ্গে এসআরবির কোনো সংস্পর্শ নেই। র্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় না করে নতুন সংস্থায় তা হস্তান্তর করা হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী সদস্যদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংশোধনী গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী সদস্যদের প্রস্তাব মতে আমরা নিয়েছি। তারা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। তার পরের দফায় যে সংশোধনী, এটা হচ্ছে ক্লারিক্যাল মিস্টেক—উপধারা দুইয়ের মধ্যে একটা ব্র্যাকেট বন্ধন। এটুকু।’
বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্টের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো পরামর্শ ছাড়াই এত দ্রুত বিলটি পাস করা যোগ্য—এটা তারা বলেছেন। আমাদের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ছিল, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ছিল, প্রতিশ্রুতি ছিল বিলুপ্ত করা হবে। আমাদের নির্বাচন ইশতেহারে ছিল, সব পক্ষের দাবি ছিল র্যাব আমরা বিলুপ্ত করছি।’
তিনি বলেন, ‘এখন এই বিল যতই বিলম্বিত হবে, র্যাব কিন্তু অস্তিত্ব ঠিকই রয়ে যাবে, র্যাবই রয়ে যাবে। এখন বিরোধী দলীয় সদস্যরা কি তাই চান?’
বিল নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ও পরামর্শ হয়নি—বিরোধীদের এমন বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনা-পরামর্শ প্রথম সেশন থেকে আমরা এর ওপর বক্তব্য রাখছি। দ্বিতীয় সেশন হয়েছে। তৃতীয় সেশনে আমরা এটা... ক্যাবিনেটে বিলটা যখন বিবেচনার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, তার আগের যে কর্মপদ্ধতি, সেই পদ্ধতি অনুসারে আমরা এটা ওয়েবসাইটে দিয়েছি। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সেটা দীর্ঘদিন ছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিলটা এখানে উত্থাপনের পরে আমরা চার-পাঁচ কার্যদিবসে সেটা আলোচনা করেছি। স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করেছি। বাইরের স্টেকহোল্ডারদের আমরা বিভিন্ন মতামত ওয়েবসাইটে পেয়েছি। সবগুলো কনসিডার করেছে। সুতরাং আলোচনা হয়েছে, পরামর্শ হয়েছে।’
র্যাব থেকে এসআরবিতে স্থানান্তরের সময় রেকর্ড কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে—বিরোধীদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি বিশিষ্ট আইনজীবী। রেকর্ড হস্তান্তরের বিষয়টা হচ্ছে একটা প্রসিডিউরাল ম্যাটার। এখানে এই বিষয়টা উত্থাপনের কোনো সুযোগই নাই। রেকর্ডটা বিধি অনুসারে রাখা।’
এসআরবির বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে ধারা ২৪-এর অভিযোগ প্রতিকার কমিটি যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ধারা ২৪ হচ্ছে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠন ইত্যাদি। ভেতরে তো আছে, ইউনিটের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি, বাইরের কোনো লোক দ্বারা উত্থাপিত অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনের জন্য এই কমিটি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা কোনো ক্রাইমের ক্ষেত্রে না। অভিযোগটা হচ্ছে, কোনো প্রাইভেট ইন্ডিভিজুয়াল এই এসআরবির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে অথবা এসআরবিরই কোনো সদস্য যদি অভ্যন্তরীণ, উইদইন ব্যাটালিয়ন কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকে, সেটা বিচারের কর্মপদ্ধতির জন্য একটা কমিটি গঠন।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ডিপার্টমেন্টাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ, উইদইন ফোর্স। সে ডিসিপ্লিন ব্রেক করল, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে সেখানে হাইকোর্টের বিচারপতিকে করার কোনো সুযোগ নাই। আর হাইকোর্টের বিচারপতিকে যদি হেড করা হয়, তাহলে অ্যাডিশনাল আইজি প্রধান হিসেবে তার নিচে থাকতে হবে। এটা ডিপার্টমেন্টাল বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা আসলে যেটা মিন করতে চেয়েছেন, সেটা হচ্ছে কোনো ক্রাইমের ক্ষেত্রে যদি এই বাহিনীর সদস্যরা কোনো ক্রাইম করে থাকেন। এই অভিযোগ সেই অভিযোগ না। ইট ইজ আন্ডার সেকশন ২১।’
ধারা ২১-এর ব্যাখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইউনিটের সদস্য কর্তৃক সংগঠিত শৃঙ্খলা লঙ্ঘন। ধারা ১৭-তে বর্ণিত শৃঙ্খলা ব্যতীত। যেটা ডিসিপ্লিনেরই অ্যাকশন, যেটা বলি আমরা সিভিল সার্ভিসে, যেটা বলা হয় সার্ভিস অ্যান্ড ডিসিপ্লিন রুলস অনুসারে যেটা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সেটার মতই।’
তিনি বলেন, ‘ধারা ১৭-তে উল্লেখ করা আছে কোন কোনগুলো ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন হবে। যেমন কর্তব্য পালনকালে মাতাল থাকলে, নেশাগ্রস্ত থাকলে, কারও ওপর বা কোনো কর্তব্যরত সদস্যকে আঘাত করলে, পেট্রোল ডিউটিতে না গেলে, ছুটি ছাড়া উপস্থিত থাকলে, অনুপস্থিত থাকলে, আইনসঙ্গত কোনো কাজ করতে অস্বীকার করলে ইত্যাদি।’
‘এইগুলো হচ্ছে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন বা ইন্ডিসিপ্লিন হওয়ার জন্য যে অ্যাকশনটা নেবে, সেটা এভাবে নির্ধারণ করা আছে—একদম সেকশন ওয়াইজ ১৮, ১৯, ২০, ২১। তবে বলছে, যদি কোনো সদস্য ক্রাইম করে থাকে, সেটা এখানে ২১ আছে—ধারা ১৭-তে বর্ণিত শৃঙ্খলা ব্যতীত ইউনিটের সদস্য কর্তৃক অন্য কোনো শৃঙ্খলা লঙ্ঘিত হইলে তাহার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। ক্লিয়ার।’
গ্রেপ্তারের পর আসামিকে কোথায় নেওয়া হবে—নোট অব ডিসেন্টে এমন প্রশ্নের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর অবিলম্বে নিকটবর্তী থানায় যাবে। এটা তো বলাই আছ সিআরপিসি অনুসারে। এখানে প্রত্যেকটা ধারায় বলা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে এবং আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করিবেন এবং এতদসংক্রান্ত প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করবেন।’
র্যাব বিলুপ্তির পর এসআরবি গঠন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই আইনটা যদি আমার বন্ধুরা বলে এটা রিপ্লেসমেন্ট অব র্যাবের রং—র্যাব আমরা বিলুপ্ত করেছি। আজকে আইন যদি পাস হয়, তারপরে আমরা একটা নতুন ব্যাটালিয়ন রেইজ করছি। সেই ব্যাটালিয়নের নাম হবে এসআরবি। র্যাবের সঙ্গে এটার কোনো সংস্পর্শ নাই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের নেত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ঠিকই বলেছেন যে তিনি বলেছেন র্যাব বিলুপ্ত করবেন। বিলুপ্ত করেছেন। আজকে আইন পাস করে দেন, র্যাব বিলুপ্ত।’
র্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সম্পদ নতুন বাহিনীতে হস্তান্তর প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যদি আপনারা একটা কথা বলেছেন যে একই জিনিস আছে, সমস্ত সহায়-সম্পত্তি এই নতুন অর্গানাইজেশনের কাছে যাবে—মানে স্পিকার, এগুলোকে নিলাম দিয়ে দেবো? এত অস্ত্র-সস্ত্র, এত ইকুইপমেন্ট, এত ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট, এত সম্পদ—এগুলো কোথায় যাবে? কোথাও না কোথাও তো যাবে। রাষ্ট্রের সম্পদ।’
তিনি বলেন, ‘সেজন্য হস্তান্তর করতে হয়। আইদার এপিবিএনে যেত অথবা নতুন সংস্থাতে যাবে। তো নতুন সংস্থা যেন আমরা রেইজ করব, এখানে তো আবার প্রোকিউরমেন্ট করার দরকার নাই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমাদের রক্ষা করতে হবে।’
অর্থ অপচয় না করার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রোকিউরমেন্ট এখানে অর্থমন্ত্রী সাহেব রয়েছেন। আবার যাতে আর্থিক কোনো ব্যবস্থা নিতে না হয়। অর্থ বরাদ্দ না হয়, অপচয় করবো না। আমরা এটাকে ব্যবহার করব। প্রয়োজনে এটাকে ইমপ্রুভ করবো।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যারা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রথম দুইজন রুহুল আমিন, জনাব রাশেদ—তাদের বক্তব্যে তেমন এখানে আইন বিষয়ে কিছু ছিল না। আমাদের জনাব বুলবুল তিনি একই কথাগুলো বলেছেন, যে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন, সে তিনিই জমা দিয়েছেন। সেগুলোর জবাব আমি দিয়েছি।’
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটি বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘র্যাব বিলুপ্ত চেয়েছিলেন, কিন্তু কারও দাবি ছিল না আরেকটি সংস্থা করার। ঠিক। এটা তো সমাজের দাবি, সরকারের পরিচালনার স্বার্থে চাহিদা এবং যুগোপযোগী করার জন্য।’
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন ইউনিট গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে যত অপরাধ এখন হচ্ছে, কোনো না কোনোভাবে সেটার সঙ্গে সাইবার স্পেসের জড়িত থাকার একটা বিষয় রয়ে যাচ্ছে। সমস্ত অপরাধের মধ্যে সাইবার স্পেস ব্যবহার করার একটা প্রবণতা রয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা সাইবার স্পেসের এই অপরাধগুলো দমন করার জন্য কোনো কার্যকর আইন আনছি না।’
তিনি বলেন, ‘সেজন্য আমরা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় আছি। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টের মধ্যে আমরা একটা অ্যামেন্ডমেন্ট নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আর পুলিশ বাহিনীর অধীনে আরেকটা ইউনিট আমরা রেইজ করব। সেটার নাম হবে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট। সেটা তো সমাজের চাহিদা।’
র্যাব গঠনের আইনগত ভিত্তি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘র্যাব নামে এই সংস্থাটি ইউনিটটি ২০০৩ অথবা ২০০৪-এ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের একটা সেকশন ৬-এর আন্ডারে রেইজ করা হয়েছিল। সেই আইনটা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। একটা সেকশনের অধীনে একটা ইউনিট কাজ করছিল। অ্যাডহক ভিত্তিতে করছিল, দীর্ঘদিন কাজ করেছে। ডিফেক্ট বেরিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সেজন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থেকে আমরা সেটা বের করে নিয়ে এসে বিলুপ্ত করতে চাই। একই সঙ্গে এই আইনের পরে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনটা পাসের জন্য দিয়েছি।’
১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সেই আইনটা ইংরেজিতে ছিল, কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল। সেই আইনটাও আমরা বঙ্গানুবাদ করে তাকে নতুন আইন হিসেবে নিয়ে আসছি এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্সটাকে আমরা রিপিল করে দিচ্ছি এবং রহিতকরণ ও হেফাজতকরণ সেকশনটা ওখানে আমরা রেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘এটা একই জিনিস রয়ে গেছে, শুধু আমরা মডার্নাইজ করেছি, বঙ্গানুবাদ করেছি। আর এখান থেকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সেকশনটা ডিলিট করে দিয়েছি। কারণ আজকে যদি আমরা র্যাপিড অ্যাকশন এখানে আইন পাস করি, এপিবিএনটা যদি আমরা সঙ্গে সঙ্গে সংশোধন না করি, তাহলে ওখানে র্যাবটা হয়ে যায়। সেজন্য এটা আমাদের জরুরি।’
এর আগে নোট অব ডিসেন্ট ও জনমত যাচাই-বাছাইয়ের বিষয়ে বিরোধী সদস্যদের বক্তব্যের জবাব দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অন্যান্য বিষয়গুলো নোট অব ডিসেন্টেরগুলো আমার মনে হয় আমি অ্যাড্রেস করেছি।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘মাননীয় বিরোধী নেতার বক্তব্যের জবাব দেই—র্যাব বিলুপ্ত চেয়েছিলেন, কিন্তু কারও দাবি ছিল না আরেকটি সংস্থা করার। ঠিক এটা তো সমাজের দাবি, সরকারের পরিচালনার স্বার্থে চাহিদা এবং যুগোপযোগী করার জন্য আমরা করছি।’

আপনার মতামত লিখুন