‘বাংলা এমন একটি বিভাগ, যেখানে তোমরা মরে গিয়েও বেঁচে থাকতে পারবে’—এমন মন্তব্য করেছেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক।
তিনি বলেছেন, মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসা থেকেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের যাত্রার শুরু থেকেই বাংলা বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলা শুধু একটি বিষয় নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের আশুলিয়া নিজস্ব ক্যাম্পাসের আয়েশা মেমোরিয়াল হলে বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই, নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক বলেন, ‘মাতৃভাষা বাংলা। এই বাংলাকে আমি ভালোবাসি। আর সেই ভালোবাসা থেকেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের যাত্রার শুরু থেকেই বাংলা বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি।’
নিজের দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করি, তখন দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত ভিত্তিই তৈরি হয়নি। আমি ১৯৮৮ সাল থেকে এ বিষয়ে চেষ্টা করেছি। পরে ১৯৯২ সালে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পের ফাইল যখন তৈরি করছি, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার অনেক সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন—আপনার মাথা কি খারাপ হয়েছে? আপনি কি পাগল হয়েছেন?’
‘আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? তারা বললেন, আপনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় করতে চান, আবার সেখানে বাংলা বিভাগও রাখতে চান! এই দুটো কি একসঙ্গে যায়?’
অধ্যাপক সাদেক বলেন, ‘আমি বললাম, কেন যাবে না? তখন তারা বলেছিলেন, বাংলা বিভাগে তো তারাই পড়ে, যারা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় না। বাংলা পড়বে গরিব মানুষ।’
এই ধারণার সঙ্গে তিনি একমত হননি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে একমত হইনি। আমি বাংলা বিভাগকে কখনো সেভাবে দেখিনি। আমি মনে করি, বাংলায় তারাই পড়বে, যাদের যোগ্যতা আছে, যাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যারা নিজেদের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে, যাদের সাহস আছে নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলেছিলাম—বাংলা হলো সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিভাগ। আমি যদি পাগল হই, পাগলই হব। আপনারা আমাকে পাগল বলতে পারেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, বাংলা বিভাগ ছাড়া এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ হবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকেই এখানে বাংলা বিভাগ আছে এবং থাকবে।’
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলা বিভাগ এমন একটি জায়গা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু একটি একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করবে না; বরং নিজেদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ তার শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এবং নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে দীর্ঘদিন মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেন এবং বিভাগের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলা ভাষা শুধু কথার বাহন নয়, বাঙালির আত্মপরিচয়েরও অনিবার্য ঠিকানা—এই চেতনাকে সামনে রেখে আয়োজন করা হয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই, নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, প্রফেসর ড. এ. এস. এম. ইকবাল হুসাইন এবং অ্যালামনাই অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর হানিফ হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রিটা আশরাফ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ঘোষণা করা হয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই কমিটি। এতে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন প্রাক্তন ছাত্র ও সাংবাদিক রনজক রিজভী, সহসভাপতি শাহীন আলম, সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আহমেদ রিপন, সহ-সাধারণ সম্পাদক কুলসুমা আক্তার ও মাহমুদুল হাসান।
এছাড়া রোকেয়া খাতুন কোষাধ্যক্ষ, তানিয়া আক্তার প্রচার সম্পাদক এবং জামিলুর রহমান সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। কমিটির সদস্যরা হলেন হোসাইন আহমেদ, এম. এ. হাবিব পলাশ ও সাদ্দাম হোসেন রুবেল।
নতুন কমিটির মাধ্যমে বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও দৃঢ় করা এবং বাংলা বিভাগের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অ্যালামনাইদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন নবনির্বাচিত সভাপতি রনজক রিজভী। পরে অতিথিরাও বক্তব্য রাখেন। বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রিটা আশরাফ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য, অ্যালামনাই কার্যক্রম এবং নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
এ পর্বে অ্যালামনাই সদস্যদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। প্রাক্তনদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেওয়ার মুহূর্তে বর্তমানের সঙ্গে অতীতের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন যেন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর শুরু হয় নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান। নৃত্য, গান, কবিতা ও অভিনয়ের নানা পরিবেশনায় শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেন বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক রূপ।
চর্যাপদের প্রাচীন সুর থেকে লোকজ সংস্কৃতি, বাঙালির জীবন ও মাটির গন্ধ—সবকিছুই উঠে আসে বিভিন্ন পরিবেশনায়। কখনও গান, কখনও নৃত্য, কখনও কবিতার ছন্দে মঞ্চ হয়ে ওঠে বাংলার মানুষের চিরচেনা উঠোন।
অনুষ্ঠানে আঞ্চলিক ভাষায় পল্লীকবির কবিতা আবৃত্তিও ছিল বিশেষ আকর্ষণ। আঞ্চলিক ভাষার সহজ-সরল উচ্চারণে যেন বাংলার মাটির নিজস্ব গন্ধ মিশে যায় পুরো আয়োজনের আবহে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বাংলা বিভাগের প্রভাষক তাজুল ইসলাম। কখনও তিনি আবির্ভূত হন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেশে, কখনও বাউল, কখনও ফোক গানের শিল্পী, আবার কখনও রক গায়কের ভূমিকায়।
এছাড়া সুর, কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয়ের বৈচিত্র্যে তিনি তুলে ধরেন চরমোনাইয়ের ওয়াজ মাহফিল, ওয়াজের পরিবেশনা এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষের পরিবেশনার স্বতন্ত্র ভঙ্গিও। একই কবিতা ও কথাকে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঙ্গিকে উপস্থাপন করে তিনি দর্শকদের যেমন আনন্দ দেন, তেমনি ভাবিয়েও তোলেন।
একটি কবিতা পরিবেশক, সুর, উচ্চারণ ও উপস্থাপনার ভঙ্গি বদলে কীভাবে ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে—তাজুল ইসলামের এই পরিবেশনা যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে ওঠে। মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যায় মঞ্চের রং, অথচ অটুট থাকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মূল সুর।
পুরো আয়োজনেই ছিল গতানুগতিকতার বাইরে যাওয়ার প্রয়াস। নবীন বরণ মানেই শুধু ফুল দিয়ে বরণ, আর বিদায় মানেই কেবল আবেগঘন বক্তব্য—এমন চেনা ছকের বাইরে গিয়ে বাংলা বিভাগ আয়োজনটিকে সাজিয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, অভিনয় ও সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক সমন্বয়ে।
ফলে পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই ছিল বৈচিত্র্য। কখনও হাসি, কখনও আবেগ, কখনও বিস্ময়, আবার কখনও শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে বাংলা বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের এক মিলনমেলা।
অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রিটা আশরাফ। আয়োজন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাংলা বিভাগের প্রভাষক তাজুল ইসলাম, প্রভাষক নিয়াম ঠাকুর ও প্রভাষক সিনথিয়া জাহান বিথুন।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রভাষক তাজুল ইসলাম ও প্রভাষক সিনথিয়া জাহান বিথুন।
সবশেষে সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জমকালো এই আয়োজন। গান থেমে যায়, মঞ্চের আলো নিভে আসে; কিন্তু থেকে যায় কিছু মুখ, কিছু স্মৃতি, কিছু উচ্চারণ।
বাংলা বিভাগের এই আয়োজন যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—ভাষা কেবল পাঠ্যবিষয় নয়; ভাষা মানুষকে তার শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়, প্রজন্মকে প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করে। আর সেই শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেই মানুষ তার চিন্তা, সৃষ্টিশীলতা ও কর্মের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে।

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘বাংলা এমন একটি বিভাগ, যেখানে তোমরা মরে গিয়েও বেঁচে থাকতে পারবে’—এমন মন্তব্য করেছেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক।
তিনি বলেছেন, মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসা থেকেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের যাত্রার শুরু থেকেই বাংলা বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলা শুধু একটি বিষয় নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের আশুলিয়া নিজস্ব ক্যাম্পাসের আয়েশা মেমোরিয়াল হলে বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই, নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক বলেন, ‘মাতৃভাষা বাংলা। এই বাংলাকে আমি ভালোবাসি। আর সেই ভালোবাসা থেকেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের যাত্রার শুরু থেকেই বাংলা বিভাগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি।’
নিজের দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করি, তখন দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত ভিত্তিই তৈরি হয়নি। আমি ১৯৮৮ সাল থেকে এ বিষয়ে চেষ্টা করেছি। পরে ১৯৯২ সালে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পের ফাইল যখন তৈরি করছি, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার অনেক সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন—আপনার মাথা কি খারাপ হয়েছে? আপনি কি পাগল হয়েছেন?’
‘আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? তারা বললেন, আপনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় করতে চান, আবার সেখানে বাংলা বিভাগও রাখতে চান! এই দুটো কি একসঙ্গে যায়?’
অধ্যাপক সাদেক বলেন, ‘আমি বললাম, কেন যাবে না? তখন তারা বলেছিলেন, বাংলা বিভাগে তো তারাই পড়ে, যারা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় না। বাংলা পড়বে গরিব মানুষ।’
এই ধারণার সঙ্গে তিনি একমত হননি উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে একমত হইনি। আমি বাংলা বিভাগকে কখনো সেভাবে দেখিনি। আমি মনে করি, বাংলায় তারাই পড়বে, যাদের যোগ্যতা আছে, যাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যারা নিজেদের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে, যাদের সাহস আছে নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলেছিলাম—বাংলা হলো সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ বিভাগ। আমি যদি পাগল হই, পাগলই হব। আপনারা আমাকে পাগল বলতে পারেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, বাংলা বিভাগ ছাড়া এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ হবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকেই এখানে বাংলা বিভাগ আছে এবং থাকবে।’
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলা বিভাগ এমন একটি জায়গা, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু একটি একাডেমিক ডিগ্রি অর্জন করবে না; বরং নিজেদের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ তার শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এবং নিজের সৃষ্টির মাধ্যমে দীর্ঘদিন মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বাংলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেন এবং বিভাগের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলা ভাষা শুধু কথার বাহন নয়, বাঙালির আত্মপরিচয়েরও অনিবার্য ঠিকানা—এই চেতনাকে সামনে রেখে আয়োজন করা হয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই, নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, প্রফেসর ড. এ. এস. এম. ইকবাল হুসাইন এবং অ্যালামনাই অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর হানিফ হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রিটা আশরাফ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ঘোষণা করা হয় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বাংলা বিভাগের অ্যালামনাই কমিটি। এতে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন প্রাক্তন ছাত্র ও সাংবাদিক রনজক রিজভী, সহসভাপতি শাহীন আলম, সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আহমেদ রিপন, সহ-সাধারণ সম্পাদক কুলসুমা আক্তার ও মাহমুদুল হাসান।
এছাড়া রোকেয়া খাতুন কোষাধ্যক্ষ, তানিয়া আক্তার প্রচার সম্পাদক এবং জামিলুর রহমান সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। কমিটির সদস্যরা হলেন হোসাইন আহমেদ, এম. এ. হাবিব পলাশ ও সাদ্দাম হোসেন রুবেল।
নতুন কমিটির মাধ্যমে বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও দৃঢ় করা এবং বাংলা বিভাগের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অ্যালামনাইদের সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অ্যালামনাইদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন নবনির্বাচিত সভাপতি রনজক রিজভী। পরে অতিথিরাও বক্তব্য রাখেন। বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রিটা আশরাফ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য, অ্যালামনাই কার্যক্রম এবং নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
এ পর্বে অ্যালামনাই সদস্যদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। প্রাক্তনদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেওয়ার মুহূর্তে বর্তমানের সঙ্গে অতীতের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন যেন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর শুরু হয় নবীন বরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান। নৃত্য, গান, কবিতা ও অভিনয়ের নানা পরিবেশনায় শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেন বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক রূপ।
চর্যাপদের প্রাচীন সুর থেকে লোকজ সংস্কৃতি, বাঙালির জীবন ও মাটির গন্ধ—সবকিছুই উঠে আসে বিভিন্ন পরিবেশনায়। কখনও গান, কখনও নৃত্য, কখনও কবিতার ছন্দে মঞ্চ হয়ে ওঠে বাংলার মানুষের চিরচেনা উঠোন।
অনুষ্ঠানে আঞ্চলিক ভাষায় পল্লীকবির কবিতা আবৃত্তিও ছিল বিশেষ আকর্ষণ। আঞ্চলিক ভাষার সহজ-সরল উচ্চারণে যেন বাংলার মাটির নিজস্ব গন্ধ মিশে যায় পুরো আয়োজনের আবহে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বাংলা বিভাগের প্রভাষক তাজুল ইসলাম। কখনও তিনি আবির্ভূত হন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বেশে, কখনও বাউল, কখনও ফোক গানের শিল্পী, আবার কখনও রক গায়কের ভূমিকায়।
এছাড়া সুর, কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয়ের বৈচিত্র্যে তিনি তুলে ধরেন চরমোনাইয়ের ওয়াজ মাহফিল, ওয়াজের পরিবেশনা এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষের পরিবেশনার স্বতন্ত্র ভঙ্গিও। একই কবিতা ও কথাকে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঙ্গিকে উপস্থাপন করে তিনি দর্শকদের যেমন আনন্দ দেন, তেমনি ভাবিয়েও তোলেন।
একটি কবিতা পরিবেশক, সুর, উচ্চারণ ও উপস্থাপনার ভঙ্গি বদলে কীভাবে ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে—তাজুল ইসলামের এই পরিবেশনা যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে ওঠে। মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যায় মঞ্চের রং, অথচ অটুট থাকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মূল সুর।
পুরো আয়োজনেই ছিল গতানুগতিকতার বাইরে যাওয়ার প্রয়াস। নবীন বরণ মানেই শুধু ফুল দিয়ে বরণ, আর বিদায় মানেই কেবল আবেগঘন বক্তব্য—এমন চেনা ছকের বাইরে গিয়ে বাংলা বিভাগ আয়োজনটিকে সাজিয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, অভিনয় ও সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক সমন্বয়ে।
ফলে পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই ছিল বৈচিত্র্য। কখনও হাসি, কখনও আবেগ, কখনও বিস্ময়, আবার কখনও শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে বাংলা বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাইদের এক মিলনমেলা।
অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. রিটা আশরাফ। আয়োজন বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাংলা বিভাগের প্রভাষক তাজুল ইসলাম, প্রভাষক নিয়াম ঠাকুর ও প্রভাষক সিনথিয়া জাহান বিথুন।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রভাষক তাজুল ইসলাম ও প্রভাষক সিনথিয়া জাহান বিথুন।
সবশেষে সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জমকালো এই আয়োজন। গান থেমে যায়, মঞ্চের আলো নিভে আসে; কিন্তু থেকে যায় কিছু মুখ, কিছু স্মৃতি, কিছু উচ্চারণ।
বাংলা বিভাগের এই আয়োজন যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—ভাষা কেবল পাঠ্যবিষয় নয়; ভাষা মানুষকে তার শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয়, প্রজন্মকে প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করে। আর সেই শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থেকেই মানুষ তার চিন্তা, সৃষ্টিশীলতা ও কর্মের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন