শেরপুর     বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
 ‍SherpurTimes24

ঝিনাইগাতীতে ব্র্যাকে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের অভিযোগের নিষ্পত্তি



ঝিনাইগাতীতে ব্র্যাকে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের অভিযোগের নিষ্পত্তি
ছবি : প্রতিনিধি

স্বামী-স্ত্রীর কলহ থেকে শুরু করে যৌতুকের দাবি, মারধর, ভরণপোষণ না দেওয়া কিংবা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনায় অনেক নারী চুপ করে থাকেন। সামাজিক চাপ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা অনেক সময় আইনের আশ্রয়ও নিতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের অভিযোগ নিয়ে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।

ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নারী ও কন্যাশিশুদের আইনগত সহায়তা, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ঝিনাইগাতীর মতো প্রত্যন্ত উপজেলায় এ ধরনের সেবা থাকায় থানায় বা আদালতে যাওয়ার আগে ভুক্তভোগীরা অন্তত তাদের অভিযোগ ও আইনি অধিকার সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ব্র্যাক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির (সেলপ) ঝিনাইগাতী কার্যালয়ে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক বিরোধের ৭৮টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে ৫৪টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। গুরুতর ও আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন; এমন ৬টি অভিযোগ আদালতে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের মাধ্যমে অন্য অভিযোগগুলোর বিষয়েও কার্যক্রম চলছে।

ব্র্যাকের এ কর্মসূচির কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, অভিযোগগুলোর মধ্যে স্বামীর হাতে স্ত্রীকে মারধর, যৌতুকের জন্য চাপ, ভরণপোষণ না দেওয়া, স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, দেনমোহর আদায় এবং পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের মতো বিষয় রয়েছে। কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর প্রথমে ভুক্তভোগীর বক্তব্য শোনা হয়। পরে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার কারণ ও পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করা হয়।

পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তবে গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, হামলা কিংবা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে শুধু সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি শেষ না করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ভুক্তভোগীকে পরামর্শ দেওয়া হয়।

ঝিনাইগাতী উপজেলার বনগাঁও এলাকার সাবিহা বলেন, পারিবারিক বিষয় হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক নারী তা প্রকাশ করতে চান না। সামাজিক সম্মান, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করেন। স্থানীয় পর্যায়ে গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকায় অনেক নারী এখন তাঁদের সমস্যার কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন।

এ প্রকল্পের সুবিধাভোগী লুবনা পারভীন নামের এক নারী বলেন, আমার বিয়ের দুই বছর পর থেকে আমার সংসারে নানা কারণে বিবাদের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য আলোচনা করা হয়। কিন্তু এতে কোন প্রতিকার না পাওয়ায়, আমি ব্র্যাকে অভিযোগ প্রদান করে। অভিযোগের পরে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে আমার সমস্যার সমাধান পাই। এখন আমার সংসারে কোন সমস্যা নাই। 

ঝিনাইগাতীর আদিবাসী নেত্রী ও শিক্ষিকা রবেতা ম্রংয়ের মতে, শুধু অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়। নারীদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

রবেতা ম্রং বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও সামাজিক চাপ ও নানা আশঙ্কায় আইনের আশ্রয় নিতে চান না। স্থানীয় পর্যায়ে সহজে পৌঁছানো যায়—এমন আইনি সহায়তা ও পরামর্শকেন্দ্র নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

মানবাধিকার কর্মী মো. নাইম ইসলাম বলেন, পারিবারিক বিরোধের কিছু ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হলেও গুরুতর নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও আইনি অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগও জরুরি।

ঝিনাইগাতী উপজেলার ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির (সেলপ)  কর্মকর্তা হোসনে আরা পারভীন বলেন, ‘নারী নির্যাতন বা পারিবারিক সহিংসতার কোনো অভিযোগকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়। সমস্যার ধরন অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হয়। আর যেসব ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে যথাযথ আইনি সহায়তার পথে নেওয়া হয়। এছাড়াও শারীরিকভাবে নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে, তাকে দুই হাজার টাকা চিকিৎসা সহায়তা  প্রদান করা হয়।'

আপনার মতামত লিখুন

 ‍SherpurTimes24

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬


ঝিনাইগাতীতে ব্র্যাকে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের অভিযোগের নিষ্পত্তি

প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

স্বামী-স্ত্রীর কলহ থেকে শুরু করে যৌতুকের দাবি, মারধর, ভরণপোষণ না দেওয়া কিংবা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনায় অনেক নারী চুপ করে থাকেন। সামাজিক চাপ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা অনেক সময় আইনের আশ্রয়ও নিতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের অভিযোগ নিয়ে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।

ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নারী ও কন্যাশিশুদের আইনগত সহায়তা, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ঝিনাইগাতীর মতো প্রত্যন্ত উপজেলায় এ ধরনের সেবা থাকায় থানায় বা আদালতে যাওয়ার আগে ভুক্তভোগীরা অন্তত তাদের অভিযোগ ও আইনি অধিকার সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ব্র্যাক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির (সেলপ) ঝিনাইগাতী কার্যালয়ে নারী নির্যাতন ও পারিবারিক বিরোধের ৭৮টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে ৫৪টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। গুরুতর ও আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন; এমন ৬টি অভিযোগ আদালতে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শের মাধ্যমে অন্য অভিযোগগুলোর বিষয়েও কার্যক্রম চলছে।

ব্র্যাকের এ কর্মসূচির কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, অভিযোগগুলোর মধ্যে স্বামীর হাতে স্ত্রীকে মারধর, যৌতুকের জন্য চাপ, ভরণপোষণ না দেওয়া, স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, দেনমোহর আদায় এবং পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের মতো বিষয় রয়েছে। কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর প্রথমে ভুক্তভোগীর বক্তব্য শোনা হয়। পরে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার কারণ ও পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করা হয়।

পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তবে গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, হামলা কিংবা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে শুধু সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি শেষ না করে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ভুক্তভোগীকে পরামর্শ দেওয়া হয়।

ঝিনাইগাতী উপজেলার বনগাঁও এলাকার সাবিহা বলেন, পারিবারিক বিষয় হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক নারী তা প্রকাশ করতে চান না। সামাজিক সম্মান, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা দিনের পর দিন নির্যাতন সহ্য করেন। স্থানীয় পর্যায়ে গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকায় অনেক নারী এখন তাঁদের সমস্যার কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন।

এ প্রকল্পের সুবিধাভোগী লুবনা পারভীন নামের এক নারী বলেন, আমার বিয়ের দুই বছর পর থেকে আমার সংসারে নানা কারণে বিবাদের সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য আলোচনা করা হয়। কিন্তু এতে কোন প্রতিকার না পাওয়ায়, আমি ব্র্যাকে অভিযোগ প্রদান করে। অভিযোগের পরে উভয় পক্ষকে নিয়ে বসে আমার সমস্যার সমাধান পাই। এখন আমার সংসারে কোন সমস্যা নাই। 

ঝিনাইগাতীর আদিবাসী নেত্রী ও শিক্ষিকা রবেতা ম্রংয়ের মতে, শুধু অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব নয়। নারীদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন।

রবেতা ম্রং বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও সামাজিক চাপ ও নানা আশঙ্কায় আইনের আশ্রয় নিতে চান না। স্থানীয় পর্যায়ে সহজে পৌঁছানো যায়—এমন আইনি সহায়তা ও পরামর্শকেন্দ্র নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

মানবাধিকার কর্মী মো. নাইম ইসলাম বলেন, পারিবারিক বিরোধের কিছু ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হলেও গুরুতর নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও আইনি অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগও জরুরি।

ঝিনাইগাতী উপজেলার ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির (সেলপ)  কর্মকর্তা হোসনে আরা পারভীন বলেন, ‘নারী নির্যাতন বা পারিবারিক সহিংসতার কোনো অভিযোগকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়। সমস্যার ধরন অনুযায়ী সমাধানের চেষ্টা করা হয়। আর যেসব ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে যথাযথ আইনি সহায়তার পথে নেওয়া হয়। এছাড়াও শারীরিকভাবে নির্যাতিত নারীদের চিকিৎসার প্রয়োজন হলে, তাকে দুই হাজার টাকা চিকিৎসা সহায়তা  প্রদান করা হয়।'


 ‍SherpurTimes24


কপিরাইট © ২০২৬ ‍SherpurTimes24 । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত