শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের ঝমেলার বয়স ৭০ পেরিয়েছে। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে তার দিন কাটে একটি বিছানায়। ঘরের চার দেয়ালই যেন তার পৃথিবী। প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে সেই ঘর থেকে বের হতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ এক দশক পর হুইলচেয়ারে বসে সেই ঘরের বাইরে এলেন ঝমেলা বেগম।
কোমর থেকে নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় নিজের শরীরটুকুও নড়াচড়া করতে পারেন না ঝমেলা। বিছানা থেকে ওঠা, বসা কিংবা প্রস্রাব-পায়খানার মতো স্বাভাবিক কাজগুলোও অন্যের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব হয় না। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এভাবেই বিছানায় পড়ে আছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তার জীবনে যেন একটু অন্য রকম দিন ছিল। এদিন দুপুরে শেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন তার বাড়িতে গিয়ে একটি হুইলচেয়ার, ১০ হাজার টাকা ও এক ব্যাগ খাবার সহায়তা দেন। পরে প্রায় ১০ বছর পর ঝমেলাকে বিছানা থেকে তুলে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঘরের বাইরে আনা হয়। শুধু তা-ই নয়, তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বসতভিটায় মাটি ভরাট, একটি ঘর নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করার কথা জানানো হয়েছে।
ঘরের বাইরে এসে কিছুক্ষণ চারপাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ঝমেলা। দীর্ঘদিনের বন্দিজীবনের পর মুক্ত বাতাসে বসার এই সামান্য সুযোগই যেন তার কাছে বড় পাওয়া।
এ সময় শেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও (শিক্ষা ও আইসিটি) সাইফুল ইসলাম কমল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রাজিবুল ইসলাম, ইউপি সদস্য ও সাংবাদিক মো. জাহিদুল হক মনির, স্বেচ্ছাসেবী ও সাংবাদিক মুজাহিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছরের বেশি আগে স্বামীকে হারিয়েছেন ঝমেলা। একমাত্র ছেলে বেঁচে থাকলেও নিয়মিত খোঁজখবর নেন না। প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন মেয়েও। ফলে জীবনের শেষ বয়সে এসে আপন বলতে তেমন কেউ নেই এ নারী।
অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে একসময় নিজের ভিটার মাটিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু তাতেও ফেরেনি সুস্থতা। অর্থের অভাবে এখন প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই দিন কাটছে তার। যে ঘরে তিনি থাকেন, সেখানেও এত দিন ছিল না বিদ্যুতের সংযোগ। অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কেটেছে তার দিন-রাত।
ঝমেলার জীবনে একসময় একটু আশ্রয় হয়ে এসেছিল জোসনা নামের একটি মেয়ে। নিজের নাতনি হিসেবে তাকে লালন-পালন করেছিলেন তিনি। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় জোসনার বিয়ে হয়। কিন্তু অভাব পিছু ছাড়েনি। বর্তমানে জোসনার পরিবারও অন্যের বাড়িতে বসবাস করে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও অসহায় ঝমেলার নিয়মিত দেখাশোনা করা তাদের পক্ষে কঠিন।
এলাকার মানুষজনের সহায়তায় কোনোভাবে খাবার জোটে। কিন্তু চিকিৎসা, থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থা কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সেবার অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এই বৃদ্ধা। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝমেলা কোনো সরকারি ভাতাও পান না।
দীর্ঘ ১০ বছর পর মঙ্গলবার ঘরের বাইরে এসে হুইলচেয়ারে বসেছিলেন ঝমেলা। হয়তো জীবনের বড় কোনো চাওয়া তার নেই। দরকার শুধু একটু চিকিৎসা, মাথার ওপর নিরাপদ একটি ছাদ, আলো জ্বলা একটি ঘর আর শেষ দিনগুলোতে পাশে দাঁড়ানোর মতো কিছু মানুষ।
জীবনের এতটা পথ কষ্টে পাড়ি দেওয়া ঝমেলার জন্য প্রশাসনের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি হুইলচেয়ার বা কিছু অর্থ সহায়তা নয়। এ যেন দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকা একজন মানুষের জীবনে একটু আলো ফেরার আশ্বাস।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ঝমেলা বেগমের অসহায়ত্বের বিষয়টি জানতে পেরে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছি। হুইলচেয়ার ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আওতায় তাকে আনারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার দীঘিরপাড় গ্রামের ঝমেলার বয়স ৭০ পেরিয়েছে। জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে তার দিন কাটে একটি বিছানায়। ঘরের চার দেয়ালই যেন তার পৃথিবী। প্রায় ১০ বছরের বেশি সময় ধরে সেই ঘর থেকে বের হতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ এক দশক পর হুইলচেয়ারে বসে সেই ঘরের বাইরে এলেন ঝমেলা বেগম।
কোমর থেকে নিচের অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ায় নিজের শরীরটুকুও নড়াচড়া করতে পারেন না ঝমেলা। বিছানা থেকে ওঠা, বসা কিংবা প্রস্রাব-পায়খানার মতো স্বাভাবিক কাজগুলোও অন্যের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব হয় না। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এভাবেই বিছানায় পড়ে আছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তার জীবনে যেন একটু অন্য রকম দিন ছিল। এদিন দুপুরে শেরপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন তার বাড়িতে গিয়ে একটি হুইলচেয়ার, ১০ হাজার টাকা ও এক ব্যাগ খাবার সহায়তা দেন। পরে প্রায় ১০ বছর পর ঝমেলাকে বিছানা থেকে তুলে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ঘরের বাইরে আনা হয়। শুধু তা-ই নয়, তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার বসতভিটায় মাটি ভরাট, একটি ঘর নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করার কথা জানানো হয়েছে।
ঘরের বাইরে এসে কিছুক্ষণ চারপাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন ঝমেলা। দীর্ঘদিনের বন্দিজীবনের পর মুক্ত বাতাসে বসার এই সামান্য সুযোগই যেন তার কাছে বড় পাওয়া।
এ সময় শেরপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও (শিক্ষা ও আইসিটি) সাইফুল ইসলাম কমল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. রাজিবুল ইসলাম, ইউপি সদস্য ও সাংবাদিক মো. জাহিদুল হক মনির, স্বেচ্ছাসেবী ও সাংবাদিক মুজাহিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছরের বেশি আগে স্বামীকে হারিয়েছেন ঝমেলা। একমাত্র ছেলে বেঁচে থাকলেও নিয়মিত খোঁজখবর নেন না। প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেছেন মেয়েও। ফলে জীবনের শেষ বয়সে এসে আপন বলতে তেমন কেউ নেই এ নারী।
অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার পেছনে একসময় নিজের ভিটার মাটিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু তাতেও ফেরেনি সুস্থতা। অর্থের অভাবে এখন প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই দিন কাটছে তার। যে ঘরে তিনি থাকেন, সেখানেও এত দিন ছিল না বিদ্যুতের সংযোগ। অন্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কেটেছে তার দিন-রাত।
ঝমেলার জীবনে একসময় একটু আশ্রয় হয়ে এসেছিল জোসনা নামের একটি মেয়ে। নিজের নাতনি হিসেবে তাকে লালন-পালন করেছিলেন তিনি। পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় জোসনার বিয়ে হয়। কিন্তু অভাব পিছু ছাড়েনি। বর্তমানে জোসনার পরিবারও অন্যের বাড়িতে বসবাস করে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও অসহায় ঝমেলার নিয়মিত দেখাশোনা করা তাদের পক্ষে কঠিন।
এলাকার মানুষজনের সহায়তায় কোনোভাবে খাবার জোটে। কিন্তু চিকিৎসা, থাকার উপযুক্ত ব্যবস্থা কিংবা নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় সেবার অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন এই বৃদ্ধা। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝমেলা কোনো সরকারি ভাতাও পান না।
দীর্ঘ ১০ বছর পর মঙ্গলবার ঘরের বাইরে এসে হুইলচেয়ারে বসেছিলেন ঝমেলা। হয়তো জীবনের বড় কোনো চাওয়া তার নেই। দরকার শুধু একটু চিকিৎসা, মাথার ওপর নিরাপদ একটি ছাদ, আলো জ্বলা একটি ঘর আর শেষ দিনগুলোতে পাশে দাঁড়ানোর মতো কিছু মানুষ।
জীবনের এতটা পথ কষ্টে পাড়ি দেওয়া ঝমেলার জন্য প্রশাসনের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি হুইলচেয়ার বা কিছু অর্থ সহায়তা নয়। এ যেন দীর্ঘদিন অন্ধকারে থাকা একজন মানুষের জীবনে একটু আলো ফেরার আশ্বাস।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ঝমেলা বেগমের অসহায়ত্বের বিষয়টি জানতে পেরে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তার পাশে দাঁড়িয়েছি। হুইলচেয়ার ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি তার জন্য একটি নিরাপদ ঘর, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আওতায় তাকে আনারও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন