বাঘের ভয়ে মানুষ খাঁচায় না ঢুকলেও, মশার ভয়ে দিনের বেলাতেও মশারির ভিতরে ঢুকে বসে থাকতে হচ্ছে ময়মনসিংহের নগরবাসীদের। মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেও নেই কোন প্রতিকার। দিনের বেলায় মশাদের উৎপাত থাকলেও, সন্ধ্যা বাড়ার সাথে সাথে এদের অত্যাচার বেড়ে যায় কয়েকগুন বেশি। কোথাও বসে মিলে না শান্তি। গুনগুনিয়ে গান শুনিয়েই বসিয়ে দেয় কামড়। এতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
মশক নিধনে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন মশার ঔষধ ছিটালেও তা কাজে আসছে না। উল্টো যেন বাড়ছে মশার বংশবিস্তার। মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা এখন থেকে না নিলে এ বর্ষা মৌসুমে মশা দ্বারা সৃষ্ট রোগব্যাধি বাড়বে বলে আশংকা করছেন নগরবাসী।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের সব গুলোতেই বেড়েছে মশার উপদ্রব। কোথাও বসলে ঘিরে ধরে মশা। ২১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম জানান, মশার কারনে না থাকা যায় ঘরে, না থাকা যায় বাইরে। দিনের বেলায় মশারি খাটিয়ে থাকতে হয়। একে ত গরম বেশি, তার উপর মশার যন্ত্রনা। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। মশার কামড়ে ঘুমাতে পারে না তারা।
৩১ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা দিপু ঘোষ জানান, নতুন ওয়ার্ড গুলো বরাবরই সবদিক থেকে আছে পিছিয়ে। এখানে না আসে মশার ঔষধ ছিটানোর মেশিন, না আসে ঝোপঝাড় পরিস্কার করার লোক। যার কারনে এসব এলাকায় মশা বেড়েছে অনেক। যদি মশার ঔষধ আর ঝোপঝাড় গুলো পরিস্কার করা হত নিয়মিত তাহলে মশার যন্ত্রনা থেকে রেহাই পাওয়া যেত।
চরপাড়া এলাকার হকার সোহেল মিয়া জানান, মশার কামড়ে দাড়িয়ে ব্যবসা করা যায় না। মশা যেখানে কামড়ায় সেখানেই প্রচুর চুলকায়। ড্রেন গুলো পরিস্কার না করার মশা বেড়েছে। সন্ধ্যা হলেই মেনহোলের ঢাকনা থেকে মশা বের হতে শুরু করে।
শহরের মাসকান্দা এলাকায় টিটিসি সামনে চা দোকানে বসা সোলেমান কাদের বলেন, এককাপ চা খেতে বসেছি। এরমধ্যে মনে হয় কমপক্ষে ৩০-৪০টা মশা কামড় দিয়েছে। শান্তিটা কোথায় এই মশার জন্য। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, মশার কয়েল, স্প্রে দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মশা। দরজা জানালা সবসময় বন্ধ রাখতে হয়। তারপরও মশা ঢুকে পড়ে ঘরে। এই মশার কারনে শিক্ষার্থীরা পড়ায় মন দিতে পারছে না। যদি দ্রুত কর্তৃপক্ষ মশা নিধনে ব্যবস্থা নেয় তাহলে আমরা নগরবাসী একটু শান্তি পাই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক এর মহানগর শাখার সাধারন সম্পাদক আলী ইউসুফ জানান, মশা নিধনে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এটা শুধু জেলা প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশনের না। আমরা সবাই যদি সচেতন হই, যার যার ঘরবাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখি, কোথাও পানি জমতে না দেই তাহলে মশার উপদ্রব অনেকটা কমে আসবে। কিন্তু তারপরও বিশেষ ভাবে এগিয়ে আসতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে। অনেক নির্মাণাধীন ভবনে দিনের পর দিন পানি জমে থাকছে। সেখান থেকে বংশবিস্তার করছে মশা। এসব নির্মাণাধীন ভবন মালুকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অভিযান চালাতে হবে। বর্ষার আগে যদি এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে আগামীতে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে গতবছর ডেঙ্গুর হটস্পট ছিলো ময়মনসিংহ।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: এইচ কে দেবনাথ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশক নিধনে দেড় কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছিল। এবারও বাজেট কোটি টাকার বেশি। শুধু ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়। জনগণকেও নিজ নিজ উদ্যোগে বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। বাসাবাড়িতে মশার প্রজনন ও উৎসস্থল ধ্বংস এবং আবর্জনা সরিয়ে ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে। যাদের বাড়িতে ফুলের টব আছে, সেখানে পানি বেশিদিন জমিয়ে রাখা যাবে না। কেউ নালা-নর্দমায় বা খালে এবং পানি চলাচলের পথে পলিথিন, প্লাস্টিক, বর্জ্য-আবর্জনা ফেলা যাবে না। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় দ্রুত মশা নিধন হবে।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন জানান, মশা পুরোপুরি নিধন করা না গেলেও তা সহনীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা করছে সিটি কর্পোরেশন। মশার উৎপত্তিস্থল গুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। নগরী পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে। ড্রেন খাল গুলো পরিস্কার করা হচ্ছে। মশা নিধনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বিমান বাহিনী থেকে ক্রয় করা হচ্ছে। নগরবাসী যেন শান্তিতে থাকতে পারে তারজন্য যত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশন তা করবে। তবে এর জন্য নগরবাসীকেও আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে মার্চ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন। মশক নিধনে অংশগ্রহন করেন ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ। তিনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তার এক মাসের সম্মানী ভাতা জেলা প্রশাসনকে দেওয়ার ঘোষনা দেন।
সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ময়মনসিংহে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। যার ফলে বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কমে আসবে। প্রতি সপ্তাহের শনিবার ছাড়াও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ কার্যক্রম পুরো মৌসুম জুড়ে চলবে।
জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে। তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে নগরীর বাসিন্দাদের অনুরোধ জানান।
বিষয় : ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
বাঘের ভয়ে মানুষ খাঁচায় না ঢুকলেও, মশার ভয়ে দিনের বেলাতেও মশারির ভিতরে ঢুকে বসে থাকতে হচ্ছে ময়মনসিংহের নগরবাসীদের। মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেও নেই কোন প্রতিকার। দিনের বেলায় মশাদের উৎপাত থাকলেও, সন্ধ্যা বাড়ার সাথে সাথে এদের অত্যাচার বেড়ে যায় কয়েকগুন বেশি। কোথাও বসে মিলে না শান্তি। গুনগুনিয়ে গান শুনিয়েই বসিয়ে দেয় কামড়। এতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
মশক নিধনে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন মশার ঔষধ ছিটালেও তা কাজে আসছে না। উল্টো যেন বাড়ছে মশার বংশবিস্তার। মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা এখন থেকে না নিলে এ বর্ষা মৌসুমে মশা দ্বারা সৃষ্ট রোগব্যাধি বাড়বে বলে আশংকা করছেন নগরবাসী।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের সব গুলোতেই বেড়েছে মশার উপদ্রব। কোথাও বসলে ঘিরে ধরে মশা। ২১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম জানান, মশার কারনে না থাকা যায় ঘরে, না থাকা যায় বাইরে। দিনের বেলায় মশারি খাটিয়ে থাকতে হয়। একে ত গরম বেশি, তার উপর মশার যন্ত্রনা। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। মশার কামড়ে ঘুমাতে পারে না তারা।
৩১ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা দিপু ঘোষ জানান, নতুন ওয়ার্ড গুলো বরাবরই সবদিক থেকে আছে পিছিয়ে। এখানে না আসে মশার ঔষধ ছিটানোর মেশিন, না আসে ঝোপঝাড় পরিস্কার করার লোক। যার কারনে এসব এলাকায় মশা বেড়েছে অনেক। যদি মশার ঔষধ আর ঝোপঝাড় গুলো পরিস্কার করা হত নিয়মিত তাহলে মশার যন্ত্রনা থেকে রেহাই পাওয়া যেত।
চরপাড়া এলাকার হকার সোহেল মিয়া জানান, মশার কামড়ে দাড়িয়ে ব্যবসা করা যায় না। মশা যেখানে কামড়ায় সেখানেই প্রচুর চুলকায়। ড্রেন গুলো পরিস্কার না করার মশা বেড়েছে। সন্ধ্যা হলেই মেনহোলের ঢাকনা থেকে মশা বের হতে শুরু করে।
শহরের মাসকান্দা এলাকায় টিটিসি সামনে চা দোকানে বসা সোলেমান কাদের বলেন, এককাপ চা খেতে বসেছি। এরমধ্যে মনে হয় কমপক্ষে ৩০-৪০টা মশা কামড় দিয়েছে। শান্তিটা কোথায় এই মশার জন্য। আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, মশার কয়েল, স্প্রে দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না মশা। দরজা জানালা সবসময় বন্ধ রাখতে হয়। তারপরও মশা ঢুকে পড়ে ঘরে। এই মশার কারনে শিক্ষার্থীরা পড়ায় মন দিতে পারছে না। যদি দ্রুত কর্তৃপক্ষ মশা নিধনে ব্যবস্থা নেয় তাহলে আমরা নগরবাসী একটু শান্তি পাই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক এর মহানগর শাখার সাধারন সম্পাদক আলী ইউসুফ জানান, মশা নিধনে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এটা শুধু জেলা প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশনের না। আমরা সবাই যদি সচেতন হই, যার যার ঘরবাড়ি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখি, কোথাও পানি জমতে না দেই তাহলে মশার উপদ্রব অনেকটা কমে আসবে। কিন্তু তারপরও বিশেষ ভাবে এগিয়ে আসতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে। অনেক নির্মাণাধীন ভবনে দিনের পর দিন পানি জমে থাকছে। সেখান থেকে বংশবিস্তার করছে মশা। এসব নির্মাণাধীন ভবন মালুকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অভিযান চালাতে হবে। বর্ষার আগে যদি এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে আগামীতে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে গতবছর ডেঙ্গুর হটস্পট ছিলো ময়মনসিংহ।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা: এইচ কে দেবনাথ বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশক নিধনে দেড় কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছিল। এবারও বাজেট কোটি টাকার বেশি। শুধু ওষুধ ছিটানোই যথেষ্ট নয়। জনগণকেও নিজ নিজ উদ্যোগে বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখতে হবে। বাসাবাড়িতে মশার প্রজনন ও উৎসস্থল ধ্বংস এবং আবর্জনা সরিয়ে ফেলে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে। যাদের বাড়িতে ফুলের টব আছে, সেখানে পানি বেশিদিন জমিয়ে রাখা যাবে না। কেউ নালা-নর্দমায় বা খালে এবং পানি চলাচলের পথে পলিথিন, প্লাস্টিক, বর্জ্য-আবর্জনা ফেলা যাবে না। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় দ্রুত মশা নিধন হবে।
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো: রুকুনোজ্জামান রোকন জানান, মশা পুরোপুরি নিধন করা না গেলেও তা সহনীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা করছে সিটি কর্পোরেশন। মশার উৎপত্তিস্থল গুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। নগরী পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে। ড্রেন খাল গুলো পরিস্কার করা হচ্ছে। মশা নিধনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বিমান বাহিনী থেকে ক্রয় করা হচ্ছে। নগরবাসী যেন শান্তিতে থাকতে পারে তারজন্য যত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সিটি কর্পোরেশন তা করবে। তবে এর জন্য নগরবাসীকেও আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে মার্চ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন। মশক নিধনে অংশগ্রহন করেন ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ। তিনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তার এক মাসের সম্মানী ভাতা জেলা প্রশাসনকে দেওয়ার ঘোষনা দেন।
সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ময়মনসিংহে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। যার ফলে বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকটাই কমে আসবে। প্রতি সপ্তাহের শনিবার ছাড়াও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ কার্যক্রম পুরো মৌসুম জুড়ে চলবে।
জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকাগুলোতে পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে। তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে নগরীর বাসিন্দাদের অনুরোধ জানান।

আপনার মতামত লিখুন