ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ি এলাকার বারোমারী সাধু লিও’র খ্রিস্টান ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ দুই দিনব্যাপী ‘ফাতেমা রাণীর’ তীর্থোৎসব সমাপ্ত হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বেলা সাড়ে বরোটার সময় মহাখ্রিস্টযাগের মাধ্যমে এই বার্ষিক তীর্থোৎসব সমাপ্ত হয়।
তীর্থোৎসবকে ঘিরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শেরপুর সীমান্তের বারোমারী খ্রিস্টধর্মপল্লী এবং আশপাশ গ্রামের গারো সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। উৎসবের একদিন আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খ্রিস্টভক্তরা তীর্থস্থানে আসতে শুরু করেন। প্রশাসন থেকেও তীর্থযাত্রীদের জন্য নেওয়া হয় নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় পবিত্র খ্রিস্টযাগ ও প্রার্থনার মাধ্যমে উৎসবের শুভ সূচনা করা হয়। রাত আটটায় আলোক শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাজার হাজার খ্রিস্টভক্তরা নিজেদের পাপ মোচনে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড়ি ক্রশের পথ অতিক্রম করেন। এসময় মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয় গারো পাহাড়ি এলাকা। পরে মহাখ্রিস্টযাগ, পাপস্বীকার, নিশি জাগরণ এবং শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথসহ নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে প্রধান পুরোহিত হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পৌল কুবি সিএসসি।
নেত্রকোনা জেলার তীর্থযাত্রী সোনালী চাম্বুগং বলেন, আমার মনের আশা পূরনে এই তীর্থস্থানের জন্য আমি মানত করেছিলাম। এখানে এসে সেই মানত পুর্ণ করে মা মারিয়ার চরণে প্রনাম করলাম। এখন আমার খুব ভালো লাগছে।
তীর্থযাত্রার আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী খ্রিস্টান মিশনের পালপুরোহিত রেভারেন্ড ফাদার তরুণ বনোয়ারী বলেন, “আমরা ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। এবারের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো থাকায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সুশৃঙ্খল পরিবেশ ও শান্তি প্রিয়ভাবে তীর্থ অনুষ্ঠান সমাপ্তি করতে পেরেছি। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসন আমাদেরকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।”
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “আমরা জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছি। প্রায় অর্ধলক্ষাধিক খ্রিস্টভক্তদের অংশ গ্রহনের মাধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তীর্থোৎসব সমাপ্তি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রতিবছর যাতে এমন পরিবেশ বজায় থাকে সেই প্রত্যাশা রাখছি।”
ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্মপ্রদেশীয় বিশপ পনেন পৌল কুবি সিএসসি বলেন, “এবারের তীর্থোৎসবের মুলসুর ছিল "মানবতার জননী ফাতেমা রানী মা মারিয়া। এই তীর্থযাত্রায় অংশগ্রহন করে কুমারী মা মারিয়ার জীবনাদর্শ তাদের জীবনে প্রতিফলন করবেন খ্রিস্টভক্তরা। এতে তারা যিশু খ্রিস্টের অনুগত ভক্ত হিসেবে জীবন যাপন করতে পারবেন। এখানে আসেন তারা পাপ মোচন করার জন্য।”
এদিকে, তীর্থস্থানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগতদের জন্য ছিল সুন্দর ব্যবস্থাপনা। তীর্থোৎসবের পাশের মাঠে বসেছিল খ্রিস্টধর্মীয় বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর দোকান, গারো সম্প্রদায়ের নারীদের ব্যবহারের ঐতিহ্যবাহী নানান পোশাক, চুরি-মালা, বাসা-বাড়ি, গৃহস্থালির আসবাবপত্র, শো-পিচ, শিশুদের নানান খেলনাসহ বিভিন্ন বাহারি পণ্যের মেলা। এই মেলায় খ্রিস্টভক্ত গারো সম্প্রদায় ছাড়াও বাঙ্গালী মুসলিম এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন প্রচুর ভীড় করেন।
সুত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বার্ষিক ‘ফাতেমা রাণীর’ তীর্থোৎসব। শুধু শেরপুর জেলার খ্রিস্টভক্তরা নন, দেশ-বিদেশের হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এতে অংশগ্রহন করেন।
প্রসঙ্গত, বিগত ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বারমারী সাধু লিও’র এই খ্রিস্টধর্মপল্লীটি ১৯৯৮ সাল থেকে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। গারো পাহাড়ের বুকে পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে ও অনুকরনে তৈরি এই ধর্মপল্লীতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ তীর্থযাত্রা। এখানে স্থাপন করা হয়েছে ৪৮ ফুট উচু মা-মারিয়ার বিশাল একটি মুর্তি।

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ি এলাকার বারোমারী সাধু লিও’র খ্রিস্টান ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ দুই দিনব্যাপী ‘ফাতেমা রাণীর’ তীর্থোৎসব সমাপ্ত হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বেলা সাড়ে বরোটার সময় মহাখ্রিস্টযাগের মাধ্যমে এই বার্ষিক তীর্থোৎসব সমাপ্ত হয়।
তীর্থোৎসবকে ঘিরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শেরপুর সীমান্তের বারোমারী খ্রিস্টধর্মপল্লী এবং আশপাশ গ্রামের গারো সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে বয়ে যায় উৎসবের আমেজ। উৎসবের একদিন আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খ্রিস্টভক্তরা তীর্থস্থানে আসতে শুরু করেন। প্রশাসন থেকেও তীর্থযাত্রীদের জন্য নেওয়া হয় নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় পবিত্র খ্রিস্টযাগ ও প্রার্থনার মাধ্যমে উৎসবের শুভ সূচনা করা হয়। রাত আটটায় আলোক শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাজার হাজার খ্রিস্টভক্তরা নিজেদের পাপ মোচনে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড়ি ক্রশের পথ অতিক্রম করেন। এসময় মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয় গারো পাহাড়ি এলাকা। পরে মহাখ্রিস্টযাগ, পাপস্বীকার, নিশি জাগরণ এবং শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথসহ নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে প্রধান পুরোহিত হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পৌল কুবি সিএসসি।
নেত্রকোনা জেলার তীর্থযাত্রী সোনালী চাম্বুগং বলেন, আমার মনের আশা পূরনে এই তীর্থস্থানের জন্য আমি মানত করেছিলাম। এখানে এসে সেই মানত পুর্ণ করে মা মারিয়ার চরণে প্রনাম করলাম। এখন আমার খুব ভালো লাগছে।
তীর্থযাত্রার আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী খ্রিস্টান মিশনের পালপুরোহিত রেভারেন্ড ফাদার তরুণ বনোয়ারী বলেন, “আমরা ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। এবারের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো থাকায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সুশৃঙ্খল পরিবেশ ও শান্তি প্রিয়ভাবে তীর্থ অনুষ্ঠান সমাপ্তি করতে পেরেছি। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসন আমাদেরকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।”
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “আমরা জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছি। প্রায় অর্ধলক্ষাধিক খ্রিস্টভক্তদের অংশ গ্রহনের মাধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তীর্থোৎসব সমাপ্তি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রতিবছর যাতে এমন পরিবেশ বজায় থাকে সেই প্রত্যাশা রাখছি।”
ময়মনসিংহ খ্রিস্টধর্মপ্রদেশীয় বিশপ পনেন পৌল কুবি সিএসসি বলেন, “এবারের তীর্থোৎসবের মুলসুর ছিল "মানবতার জননী ফাতেমা রানী মা মারিয়া। এই তীর্থযাত্রায় অংশগ্রহন করে কুমারী মা মারিয়ার জীবনাদর্শ তাদের জীবনে প্রতিফলন করবেন খ্রিস্টভক্তরা। এতে তারা যিশু খ্রিস্টের অনুগত ভক্ত হিসেবে জীবন যাপন করতে পারবেন। এখানে আসেন তারা পাপ মোচন করার জন্য।”
এদিকে, তীর্থস্থানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগতদের জন্য ছিল সুন্দর ব্যবস্থাপনা। তীর্থোৎসবের পাশের মাঠে বসেছিল খ্রিস্টধর্মীয় বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর দোকান, গারো সম্প্রদায়ের নারীদের ব্যবহারের ঐতিহ্যবাহী নানান পোশাক, চুরি-মালা, বাসা-বাড়ি, গৃহস্থালির আসবাবপত্র, শো-পিচ, শিশুদের নানান খেলনাসহ বিভিন্ন বাহারি পণ্যের মেলা। এই মেলায় খ্রিস্টভক্ত গারো সম্প্রদায় ছাড়াও বাঙ্গালী মুসলিম এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন প্রচুর ভীড় করেন।
সুত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বার্ষিক ‘ফাতেমা রাণীর’ তীর্থোৎসব। শুধু শেরপুর জেলার খ্রিস্টভক্তরা নন, দেশ-বিদেশের হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এতে অংশগ্রহন করেন।
প্রসঙ্গত, বিগত ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বারমারী সাধু লিও’র এই খ্রিস্টধর্মপল্লীটি ১৯৯৮ সাল থেকে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। গারো পাহাড়ের বুকে পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে ও অনুকরনে তৈরি এই ধর্মপল্লীতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ তীর্থযাত্রা। এখানে স্থাপন করা হয়েছে ৪৮ ফুট উচু মা-মারিয়ার বিশাল একটি মুর্তি।

আপনার মতামত লিখুন